চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ছোট লক্ষীপুর গ্রামে গত ১৭ জুন এক যুবককে চাঁদা না দেওয়ায় তুলে নিয়ে চার ঘণ্টা শারীরিক নির্যাতন এবং তার বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ওই যুবক আল আমিন সরকারের স্ত্রী আলেয়া বেগম বাদী হয়ে মতলব উত্তর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে অভিযুক্তরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, এটি পূর্ব বিরোধের জেরে মিথ্যা প্রচারণা। স্থানীয় একটি ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে এই ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
আলেয়া বেগমের অভিযোগে বলা হয়, ছোট লক্ষীপুর গ্রামের প্রয়াত সেনা কর্মকর্তা সাইফুল আনোয়ার মতিনের ছেলে হাসনাত সরকার (৪০), মো. সোহেল (৫০) স্বনামধন্য ব্যবসায়ী, সিরাজ সরকারের ছেলে মো. মাসুম (৩০), আফিয়া বেগম, আংকুরি বেগমসহ অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জন গত ১৭ জুন বিকেলে মোটরসাইকেলে এসে তাদের বাড়িতে হামলা চালান। তারা লাঠি, সোটা, দাওসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘরের দরজা-জানালা ভাঙচুর করে আল আমিনকে মারধর করেন। তাকে মাটিতে ফেলে আঘাত করে তার শরীরে নীলাফোলা জখম করা হয়। আলেয়ার দাবি, হাসনাত সরকার তার চুল ধরে টানাহেঁচড়া করে, দেড় ভরি স্বর্ণালংকার ও জমি বিক্রির চার লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যান।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আল আমিনকে মোটরসাইকেলে করে প্রথমে লক্ষীপুর বালুর মাঠে এবং পরে মতলব দক্ষিণের ফেরীঘাটের কাছে একটি ইটভাটায় নিয়ে চার ঘণ্টা নির্যাতন করা হয়। এ সময় তার পরিবারের কাছে মোবাইলে এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। না হলে আল আমিনকে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয়। পরে মতলব দক্ষিণ থানার পুলিশ রাত ৯টায় আল আমিনকে উদ্ধার করে।
আহত আল আমিন বলেন, “হাসনাত, সোহেলসহ ১০-১২ জন মোটরসাইকেলে এসে আমাকে মারধর শুরু করে। আমার বাবা ও স্ত্রী এগিয়ে আসলে তাদেরও মারপিট করা হয়। পরে আমাকে তুলে নিয়ে বালুর মাঠ ও ইটভাটায় নির্যাতন করা হয়। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।”
আলেয়া বেগম বলেন, “আমার স্বামী ও শ্বশুরকে মারধর করা হয়েছে। আমি বাধা দিতে গেলে আমাকেও মারধর করা হয়, আমার কাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়। এই অপরাধের কঠিন শাস্তি চাই।”
প্রত্যক্ষদর্শী তাছলিমা ও মৌসুমী আক্তার দাবি করেন, হাসনাত ও সোহেল বহিরাগত লোকজন নিয়ে এসে আল আমিনের বাড়িতে ভাঙচুর ও মারধর করেন। তারা বলেন, “এরা প্রায়ই গ্রামে চাঁদা দাবি করে। না দিলে মারধর ও হুমকি দেয়। ভয়ে কেউ মুখ খোলে না।”
অভিযুক্ত হাসনাত সরকার, মো. সোহেল, মো. মাসুমসহ স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এই অভিযোগকে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। তাদের দাবি, আল আমিনের পরিবারের সঙ্গে তাদের জমি নিয়ে পূর্ব থেকে বিরোধ চলে আসছে। এই বিরোধের জেরে আল আমিনের পরিবার তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়েছে।
স্থানীয় একজন প্রবীণ ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “হাসনাত ও সোহেল এলাকার সম্মানিত ব্যক্তি। তারা চাঁদাবাজির মতো কাজের সঙ্গে জড়িত নন। এটি পুরনো বিরোধের ফল।”
অভিযোগ উঠেছে, আল-আমিনের পরিবারের এক সদস্য, রাফছান সরকার সিফাত—যিনি ফেনী জেলা পুলিশের সদস্য—তিনি নিজের প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় কিছু অনলাইন পোর্টাল ও পত্রিকায় টাকার বিনিময়ে এই ‘মিথ্যা’ সংবাদ প্রকাশ করিয়েছেন।
অভিযুক্ত সোহেলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সোমবার (১৬ জুন) সিফাত ছুটিতে বাড়িতে এসে মঙ্গলবার (১৭ জুন) তার কাছে ১১ লাখ টাকা দাবি করেন। হঠাৎ করে এভাবে টাকা চাওয়ায় তিনি বিস্মিত হয়ে পড়েন। তিনি জানতে চাইলে সিফাত বলেন, “থানায় দুই দিন আটকে রাখলেই টাকা বেরিয়ে আসবে, তখন বুঝতে পারবি এটা কিসের টাকা।”
সোহেল আরও বলেন, “গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর, সিফাতের সঙ্গে দ্বন্দ্বে থাকা এক ব্যক্তিকে তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে আওয়ামী লীগ কর্মী সাজিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসান।” জানা যায়, এভাবেই তিনি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কারও সঙ্গে কথা কাটাকাটি হলে, তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখানো তার জন্য যেন নিত্যদিনের ঘটনা।
এ বিষয়ে সিফাতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তার বাড়িতে গেলে পরিবারের সদস্যরা জানান, সিফাত বর্তমানে বাড়িতে নেই।
‘মেঘনা টিভি’ নামে একটি ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে এই ঘটনা নিয়ে একটি সংবাদ প্রচারিত হয়েছে, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সংবাদটিতে আল আমিনের পরিবারের অভিযোগের পক্ষে তথ্য উপস্থাপন করা হলেও অভিযুক্তদের বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এছাড়া, ‘দৈনিক বাংলাদেশ বার্তা’, ‘মতলবের খবর’ ও ‘মতলব টপ নিউজ’ নামে স্থানীয় কিছু ফেসবুক পেজেও এই ঘটনার ছবি ও তথ্য শেয়ার করা হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এসব পোস্ট একপক্ষীয় এবং ঘটনার পূর্ণ সত্যতা তুলে ধরেনি।
মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রবিউল হক বলেন, “অভিযোগ পেয়েছি। তবে অভিযোগের আগেই আল-আমিনকে মতলব দক্ষিণ থানায় হস্তান্তর করেছে অভিযুক্ত হাসনাত ও সোহেল। মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে তৎপরতা চলছে।” তবে তিনি অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি।
পুলিশ ও অভিযুক্তদের সূত্রে জানা গেছে, আলেয়া বেগমের অভিযোগের ভিত্তিতে হাসনাত সরকারকে (৪০) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মতলব উত্তর থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
ছোট লক্ষীপুরের বাসিন্দারা জানান, এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নতুন নয়। তবে, হাসনাত সরকার, মো. সোহেল সরকার কখনই এসব কাজে লিপ্ত ছিলেন না । অন্যদিকে, কিছু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তি আছেন যাদের ভয়ে অনেকেই মুখ খোলেন না। একজন বাসিন্দা বলেন, “এখানে কিছু লোক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার।”
অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন, এটি দুই পরিবারের ব্যক্তিগত বিরোধ। একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “এলাকার শান্তি রক্ষায় এ ধরনের ঘটনা মিটমাট করা উচিত। তবে সত্য যা-ই হোক, তা প্রকাশ পাওয়া জরুরি।”
এই ঘটনা পূর্ব বিরোধ, ক্ষমতার অপব্যবহার, এবং স্থানীয় রাজনীতির জটিলতার একটি প্রতিচ্ছবি। আল আমিনের পরিবারের অভিযোগ এবং অভিযুক্তদের পাল্টা দাবি দুটোই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত সংবাদের একপক্ষীয়তা এবং স্থানীয় পোর্টালে টাকার বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ সাংবাদিকতার নীতিমালা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ এলাকায় বিরোধ নিরসনে প্রায়ই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ক্ষমতাসীনদের হস্তক্ষেপ দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২৪ ঘন্টা বাংলাদেশ-এর মফঃস্বল ডেস্ক ইনচার্জ মো. মোর্শেদ আলম বলেন, “গ্রাম অঞ্চলে পারিবারিক বিরোধে নিজেদের অপরাধ ঢাকতেই এসকল (চাঁদার দাবি, লুটপাট, ভাংচুর, হেনস্থা) মিথ্যে অভিযোগ এনে থানায় মামলা দায়ের করে। প্রায় সময় এসব অভিযোগ মিথ্যা বলেই প্রমাণিত হয়ে থাকে।”
ছোট লক্ষীপুরের এই ঘটনা শুধু একটি অপরাধের অভিযোগ নয়, এটি স্থানীয় সমাজের ক্ষমতার গতিবিদ্যা এবং সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকার একটি প্রতিফলন। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে এ ধরনের ঘটনা এলাকায় অস্থিরতা বাড়াতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের উপর এখন সবার নজর।