দীর্ঘ এক দশক পর বহুল আলোচিত তনু হত্যা মামলায় প্রথমবারের মতো একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এই অগ্রগতিকে কেন্দ্র করে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে ইতোমধ্যে জনমনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি হাফিজুর রহমান, যিনি কুমিল্লা সেনানিবাসের সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার। তাকে নিজ বাসা থেকে আটক করে আদালতে হাজির করা হলে বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকেলে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হক তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের স্বার্থে রিমান্ড প্রয়োজন ছিল, যা আদালত মঞ্জুর করেছেন।
এর আগে, গত ৬ এপ্রিল মামলার সপ্তম তদন্ত কর্মকর্তা তিন সন্দেহভাজনের—সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সৈনিক জাহাঙ্গীর ওরফে জাহিদ—ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার আবেদন করেন। আদালত এতে সম্মতি দেন। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষায় তিনজন পুরুষের ডিএনএ পাওয়া গিয়েছিল।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটিতে এখন পর্যন্ত ৮০টি শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১০ বছরে চারটি সংস্থার সাতজন কর্মকর্তা এ মামলার তদন্তে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু এতদিনেও রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়নি।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সন্দেহভাজন তিনজনই বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। তবে তনু হত্যার পর তারা স্বাভাবিকভাবে অবসর নিয়েছেন, নাকি বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে—এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউজের কাছাকাছি একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লা কোতয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার পর থানা পুলিশ, ডিবি এবং সিআইডি দীর্ঘদিন তদন্ত করেও কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর কয়েক দফা তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অবশেষে বর্তমান তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।
এদিকে আদালতে উপস্থিত হয়ে তনুর বাবা ইয়ার হোসেন ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “দেশের অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের বিচার হলেও আমার মেয়ের হত্যার বিচার এখনও হয়নি। ১০ বছর ধরে আমরা ন্যায়বিচারের আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি এখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে মেয়ের হত্যার বিচার চাইতে চাই। দীর্ঘদিন ধরে এই কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছি। দ্রুত বিচার না হলে আমার আর বাঁচার ইচ্ছা নেই।”
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর এই গ্রেফতার মামলার তদন্তে নতুন গতি আনতে পারে। একই সঙ্গে এটি বিচারপ্রক্রিয়ায় আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।