ইরান যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা এবং ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশল নিয়ে মতবিরোধের প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন সেনা কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ৪৮ ঘণ্টায় তিনি জার্মানি, ইতালি ও স্পেন থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন। এরই মধ্যে পেন্টাগন জার্মানি থেকে আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে প্রায় ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
মূলত ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের সমালোচনাকে কেন্দ্র করেই এই উত্তেজনার সৃষ্টি। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস মন্তব্য করেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপমানিত’ হচ্ছে এবং সংঘাত নিরসনে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো কার্যকর কৌশল নেই। তার এই বক্তব্যের জবাবে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে কটাক্ষ করে বলেন, ইরান নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে ইউরোপের উচিত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং নিজস্ব সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়া। একই সঙ্গে তিনি জার্মানি ছাড়াও ইতালি ও স্পেন থেকে সেনা সরানোর সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন।
বর্তমানে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সেখানে প্রায় ৬৮ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। এর মধ্যে জার্মানি, ইতালি ও স্পেনেই রয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার সেনা। মার্কিন ইউরোপীয় কমান্ড ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে থাকে।
দেশভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, জার্মানিতে সবচেয়ে বেশি মার্কিন সেনা রয়েছে—প্রায় ৩৬ হাজারের বেশি। রামস্টেইন এয়ার বেস-কে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাজ্যে প্রায় ১০ হাজার, ইতালিতে ১২ হাজারের বেশি এবং স্পেনে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ সেনা মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরিতেও স্থায়ী ও ঘূর্ণায়মান মার্কিন বাহিনী অবস্থান করছে, যা ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে বাস্তবে এই সেনা প্রত্যাহার সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বড় ধরনের সামরিক পুনর্বিন্যাস করা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতীতে ২০২০ সালে ট্রাম্প জার্মানি থেকে সেনা সরানোর উদ্যোগ নিলেও কংগ্রেসের হস্তক্ষেপে তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীতে জো বাইডেন প্রশাসন সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে।
এছাড়া ২০২৬ সালের ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী, ইউরোপে মার্কিন সেনার সংখ্যা ৭৫ হাজারের নিচে নামানো যাবে না—এমন বিধানও রয়েছে, যা ট্রাম্পের পরিকল্পনার পথে বড় আইনি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইউরোপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নয়, বৈশ্বিক সামরিক কৌশলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এসব ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে—বিশেষ করে ইরাক, আফগানিস্তান ও সাম্প্রতিক ইরান সংকটে—এসব ঘাঁটি লজিস্টিক সহায়তা ও অপারেশন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি জার্মানির ল্যান্ডস্টুল মেডিকেল সেন্টার ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় মোতায়েন মার্কিন সেনাদের চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় মিত্রদের সমর্থন না পাওয়া এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধই ট্রাম্পের এই অবস্থানের মূল কারণ। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার-এর সমালোচনা করে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত সহায়তা দিচ্ছেন না। একইভাবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি-ও ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করায় ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানো তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন। আইনি বাধা, কংগ্রেসের ভূমিকা এবং কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা—সবকিছু মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।