প্রায় তিন দশক ধরে জোটবদ্ধ রাজনীতি করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে ভিন্ন অবস্থানে থাকলেও সংসদে তাদের আচরণে নতুন ধরনের সমীকরণ দেখা যাচ্ছে। একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র থাকা দল দুটি এখন সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায়—তবু গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যুতে তাদের মধ্যে সমঝোতার ইঙ্গিত মিলছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সরকারপ্রধান তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান-এর বক্তব্যে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা সহনশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার বার্তা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা এবং কিছু উন্নয়ন ইস্যুতে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ দুই পক্ষই প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অতীত সংসদীয় রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান সাধারণত ছিল মুখোমুখি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পালাক্রমে ক্ষমতায় আসার সময়ও এমন সহযোগিতার নজির খুব কমই দেখা গেছে। তবে বর্তমান সংসদে সেই প্রচলিত দ্বন্দ্বের পাশাপাশি সীমিত পরিসরে সহযোগিতার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল মনে করেন, সরকার অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে না গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্য খুঁজছে। তার ভাষায়, জ্বালানি সংকট বা সংবিধান সংশোধনের মতো বিষয়ে বিরোধী দলের সম্পৃক্ততা রাখা বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ, যা দেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
অন্যদিকে সমালোচকদের একাংশ এই অবস্থানকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে দুই দলের মধ্যে একটি নীরব বোঝাপড়া থাকতে পারে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-এর নেতা আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন দাবি করেন, এই ধরনের ঐক্য সাধারণ মানুষের স্বার্থে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতাদের অভিযোগ, সরকার প্রয়োজন ছাড়া বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাদের মতে, সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকার বাধ্য হয়েই বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত করছে।
তবে বিরোধী দলীয় শিবির থেকেও ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। জামায়াতের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তারা “বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা” করছেন না; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারকে সমর্থন বা সমালোচনা করছেন।
সংসদের ভেতরে দ্বন্দ্ব ও বাইরে নমনীয়তা—এই দ্বৈত চিত্রই বর্তমান রাজনীতির নতুন বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠছে। কখনও উত্তপ্ত বিতর্ক, আবার কখনও যৌথ কমিটি গঠন বা আলোচনায় সম্মতি—সব মিলিয়ে এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতি গড়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, সরকার সব পক্ষকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়তে চায়। তার এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন—যেখানে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা, দুটিই সমান্তরালভাবে চলছে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখনও উন্মুক্ত—এই সমঝোতা কি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা, নাকি কৌশলগত সাময়িক অবস্থান? উত্তর নির্ভর করছে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর।