শ্রমিকদের উন্নয়ন, বন্ধ কলকারখানা সচল এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন ‘প্রত্যাশিত বাংলাদেশ’ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ শুক্রবার (১ মে) মহান মে দিবস উপলক্ষে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল আয়োজিত বিশাল শ্রমিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনারা কেউ ইমারত নির্মাণ করেন, কেউ কারখানায় বা পরিবহনে কাজ করেন। আজ থেকে দেশ গড়ার শ্রমিক হিসেবে আপনাদের খাতায় আমি আমার নিজের নাম এবং আমার মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম লেখাতে চাই। আপনারা ঘর গড়েন, কলকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি করেন, আর আমরা আপনাদের পাশে থেকে শ্রমিক হিসেবেই দেশ গড়তে চাই। আমাদের লক্ষ্য একটাই—দেশ গড়া।”
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শ্রমিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
তিনি জানান, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে শ্রমিক দলের ৭২ জন সদস্য শহীদ হয়েছেন এবং তাঁদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও স্মরণ করেন বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে নয়াপল্টনের রাজপথে বিরোধী দলের ওপর চালানো নির্মম দমন-পীড়নের কথা, যেখানে প্রতিবেশী সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা নেতাকর্মীদের আশ্রয় দিয়ে মানবিকতা দেখিয়েছিলেন।
দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিগত স্বৈরাচারী শাসনের এক যুগে আমাদের শিল্পকারখানা ধ্বংস করে দেশকে আমদানিনির্ভর করা হয়েছিল। আমার সামনে একটি ব্যানার আছে—’বন্ধ কলকারখানা চালু করতে হবে’। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর আমি সংশ্লিষ্টদের সাথে বসেছি। গত এক মাস আগেই আমি বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছি কোন কোন বন্ধ কারখানা দ্রুত চালু করা সম্ভব। ইনশাআল্লাহ, এই সপ্তাহেই পরবর্তী মিটিং নির্ধারিত আছে এবং পর্যায়ক্রমে সব বন্ধ কারখানা সচল করা হবে যাতে বেকার শ্রমিকরা পুনরায় কর্মসংস্থান ফিরে পায়।”
রাস্তা থেকে হকার উচ্ছেদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি মানবিক ও স্থায়ী সমাধানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, শুধু উচ্ছেদ কোনো সমাধান নয়, হকারদের বেঁচে থাকার জন্য উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে তাঁদের সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবসা করার সুযোগ করে দেওয়া হবে। এছাড়া জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমিক, কৃষক এবং প্রাথমিক শিক্ষকদের পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। ইতিমধ্যে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে এবং কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রতিভাবান খেলোয়াড় অন্বেষণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রদর্শিত পথে আগামীকাল থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতার আদলে দেশব্যাপী কার্যক্রম শুরু হবে। পাশাপাশি কৃষি ও পানির চাহিদা মেটাতে দেশব্যাপী ঐতিহাসিক ‘খাল খনন’ কর্মসূচিও পুনরায় শুরু করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “নির্বাচনের আগেই আমরা রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা ঘোষণা করেছিলাম। সেখানে কৃষক, শ্রমিক, নারী ও ছাত্রদের প্রতিটি অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আমরা সরকার গঠন করেই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নেমে পড়েছি।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শ্রমিক ও কৃষক বাঁচলে তবেই বাংলাদেশ বাঁচবে। গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বিতর্কিত করতে একটি মহলের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে তিনি দেশবাসীকে সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, বিশ্বদরবার আজ দেখছে বর্তমান সরকার জনগণের সমর্থনে গঠিত, তাই কোনো ষড়যন্ত্র কাজে আসবে না। ১৭ বছর যেভাবে স্বৈরাচারকে জবাব দেওয়া হয়েছে, ঠিক সেভাবেই সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে প্রতিটি মানুষকে সজাগ থাকতে হবে।
বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত জনতাকে দেশ গড়ার শ্রমিক হিসেবে শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অমর বাণী স্মরণ করে বলেন, “প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ”। এই দেশই আমাদের একমাত্র ঠিকানা এবং এই দেশ গড়তে বর্তমান সরকারের প্রতিটি সদস্য শ্রমিকের ন্যায় কাজ করে যাবে। সমাবেশে বিএনপির মহাসচিবসহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং অঙ্গসংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ শ্রমিক অংশগ্রহণ করেন।
মে দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশের মঞ্চে উপস্থিত আছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ শ্রমিক দলের নেতৃবৃন্দ।