‘ঝামেলা মিটে গেছে’ বলে মীমাংসার কথা বলে ডেকে নেওয়ার পর হত্যা করা হয় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন (৫৫)-কে। এ ঘটনায় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর আধিপত্যের দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে এসেছে। গত রমজানের ঈদে যশোরে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন টিটন। সেখানে বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন ও মা আকলিমা খন্দকারের সঙ্গে দেখা করেন। তখনও প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের হুমকির মধ্যে ছিলেন বলে পরিবারকে জানিয়েছিলেন তিনি।
ঘটনার এক সপ্তাহ আগেও বড় ভাইয়ের সঙ্গে তার কথা হয়। টিটন তখন জানান, গরুর হাটের ইজারা নিয়ে ঝামেলা ছিল, তবে সেটি মিটে গেছে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার কথা হচ্ছে। কিন্তু এর কিছুদিন পরই তাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। গত ২৮ এপ্রিল রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা-তে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় টিটনকে। তদন্তে উঠে এসেছে, গরুর হাটের ইজারা এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সেদিন সন্ধ্যার পর তাকে বটতলা এলাকায় ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকে ওত পেতে থাকা হামলাকারীরা খুব কাছ থেকে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। মোহাম্মদপুরের বছিলা পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের সঙ্গে টিটনের দ্বন্দ্ব ছিল। এই বিরোধের মীমাংসার কথা বলে তাকে ডেকে এনে হত্যা করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এ ঘটনায় টিটনের বড় ভাই রিপন বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাত ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। এজাহার সূত্রে জানা যায়, টিটন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বাসিন্দা। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান এবং পরে ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
পরিবার জানায়, কারামুক্তির পর টিটন আত্মগোপনে থাকতেন এবং সরাসরি ফোনে কথা না বলে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন। ঘটনার আগের দিন প্রতিপক্ষ তাকে সমঝোতার জন্য ডেকেছিল বলে বড় ভাইকে জানান তিনি। টিটনের ভাষায়, “ঝামেলা মিটে গেছে, আমরা একসঙ্গে কাজ করবো।” কিন্তু ২৮ এপ্রিল রাতে মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীরা তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডে বাদল, শাহজাহান, রনি, সানি, সুমন, প্রিন্স, লম্বু আলম ও পারভেজসহ কয়েকজন অংশ নেয়। তাদের মধ্যে কয়েকটি দল ভাগ হয়ে টিটনকে অনুসরণ করে এবং নির্ধারিত স্থানে হামলা চালায়। ২০০১ সালে ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় টিটনের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ১৯৯০-এর দশকে অপরাধজগতে প্রবেশ করে তিনি দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। একাধিক হত্যা ও অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া বিভিন্ন শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, সেই আধিপত্যের লড়াইয়ের জেরেই টিটন হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। হামলাকারীরা কাছ থেকে গুলি চালিয়েছে এবং পালানোর সময় সিসিটিভি এড়াতে সক্ষম হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মধ্যম সারির সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত পিচ্চি হেলাল নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, গত এক মাসে টিটনের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি এবং এ ঘটনায় অন্য পক্ষ জড়িত থাকতে পারে। ডিবি পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে এবং দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে।