বাংলাদেশে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের নির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির এক সাম্প্রতিক বৈঠকে এই বিষয়ে গভীর আলোচনা হয় বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বৈঠকে নেতারা মত দেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করছে এবং জাতিকে বিভ্রান্ত করছে। তাই এখন থেকে কৌশলগত আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে হবে। আসন্ন ঈদুল আজহার পর থেকেই রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় উপস্থিতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঢাবি ছাত্রদল নেতা সাম্য হত্যাকাণ্ডে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি এবং ঢাকা দক্ষিণে ইশরাক হোসেনকে ‘বৈধ মেয়র’ ঘোষণার মতো ইস্যুতে বিএনপির বর্তমান অবস্থান মূলত একটি ‘ওয়ার্মআপ ফেজ’। দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবেই এগুলোকে দেখছে দলের নেতৃবৃন্দ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রকাশ করা হয়নি। এই অনিশ্চয়তা বিরোধী রাজনৈতিক মহলে প্রবল ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছে। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, এই ধোঁয়াশা নিছক অনিচ্ছাকৃত নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল, যার মাধ্যমে সরকার সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে বিরোধী পক্ষকে বিভ্রান্ত ও নিষ্ক্রিয় রাখতে চায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফউজুল কবির খান সম্প্রতি একটি ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “আমরা নিজেরাই ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে চাই।” যদিও বক্তব্যটি আপাতদৃষ্টিতে আশ্বাসমূলক মনে হতে পারে, বিএনপি এই মন্তব্যকে ‘আস্থা তৈরির কৌশলী বার্তা’ হিসেবেই বিবেচনা করছে। কারণ, বাস্তবে এখনো পর্যন্ত নির্বাচনের সময়সীমা, প্রক্রিয়া কিংবা কাঠামো— কিছুই স্পষ্ট নয়।
দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের আশঙ্কা, সরকার নির্বাচনের নামে একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা ধরে রাখার রূপরেখা বাস্তবায়ন করছে। এক জ্যেষ্ঠ নেতা মন্তব্য করেন, “সরকার যদি দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা না করে, তাহলে বিএনপি আগামীতে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও অবস্থান ঘোষণা করতে বাধ্য হবে।”
এই অবস্থান শুধু বিএনপির একক সিদ্ধান্ত নয়— রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন অবস্থার মধ্যে বিরোধী পক্ষগুলো একত্রিত হয়ে যুগপৎ কৌশল নির্ধারণের দিকেও এগোতে পারে।
বর্তমান রাজনীতিতে শুধু নির্বাচন নয়, আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু বিষয়েও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বিএনপি। রাখাইন রাজ্যে ‘মানবিক করিডোর’ স্থাপন ও চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশী অংশগ্রহণ সংক্রান্ত খবরগুলিকে সরকারের ‘সংবেদনশীল বিষয়ে গোপন আচরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়েও স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উদ্বেগ জানানো হয়। তাদের মতে, রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর নিপীড়ন ও বিরোধী কণ্ঠর দমন এ ইঙ্গিত দেয় যে, সরকার একতরফা নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে নির্বাচনমুখী হচ্ছে।
স্থায়ী কমিটির বৈঠক ও সর্বশেষ মাঠের কার্যক্রমগুলোকে বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপি একটি ধাপে ধাপে আন্দোলন পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে। ঢাকাসহ কিছু ছাত্র ও মহানগর ইউনিটকে ইতিমধ্যে ‘সহনীয় মাত্রায়’ মাঠে নামার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন সংক্রান্ত নির্দিষ্ট রূপরেখা আসছে না — এমন বাস্তবতায় বিএনপি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ভাষা তৈরির চেষ্টায় রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে চায়। এই উদ্দেশ্যে যুগপৎ আন্দোলন ও অংশীদার দলগুলোর সঙ্গে সক্রিয় সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও দৃশ্যমান।
পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্পষ্ট— যদি সরকার দ্রুত নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা না করে, তবে পবিত্র ঈদুল আজহার পর থেকেই বিএনপির নেতৃত্বাধীন একটি নতুন রাজনৈতিক উত্তাপ দেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান হতে পারে।