রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইতিবাচক সূচনা করলেও এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার। ‘মধুচন্দ্রিমা’ পর্ব শেষ হতে না হতেই জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ‘মব কালচার’-এর বিস্তার এবং ‘জাতীয় জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী চাপ—এই তিনটি বড় ইস্যু সরকারকে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে সরকার শুরুতেই বেশ কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়, যা অতীতের তুলনায় দ্রুততার ইঙ্গিত দেয়। সামাজিক সুরক্ষা খাতে নিম্নআয়ের মানুষ, প্রবীণ, কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ধরনের ‘স্মার্ট কার্ড’ চালুর উদ্যোগ ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পথে।
কৃষি খাতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ঋণ মওকুফ বা পুনঃতফসিলের সিদ্ধান্তও ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং জোরদার, আমদানি নীতিতে শিথিলতা এবং সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক সংস্কার ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের ইঙ্গিতও সরকার দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতার ওপর।
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি খাত। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য এখন নিয়মিত।
সরকারি হিসাবে পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করা হলেও বাস্তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি ঘাটতির কারণে দেশজুড়ে প্রতিদিন ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে।
এরই মধ্যে সরকার জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে—ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রল ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও প্রক্রিয়াধীন।
এই মূল্যবৃদ্ধিকে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর নেতারা ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু হওয়া ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির প্রবণতা এখনও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বারবার কঠোর অবস্থানের কথা জানালেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন সীমিত।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক দরবারে হামলা ও পীর হত্যার ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সংসদে স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানা দাবি করেছেন, এ ধরনের ঘটনায় ইতোমধ্যে কয়েকশ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তার মতে, বিচারহীনতা ও সামাজিক ক্ষোভ থেকেই এই পরিস্থিতির উদ্ভব।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঘোষিত ‘জাতীয় জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে টানাপোড়েন বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন না হওয়ায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এবং বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা তীব্র হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান আশ্বাস দিয়েছেন যে, আলোচনার মাধ্যমে অধ্যাদেশগুলো পাস করে সংবিধান সংশোধনের পথেই এগোবে সরকার।
চাপের মধ্যেও পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে সরকার। ইতোমধ্যে ভারত ও সিঙ্গাপুর থেকে জ্বালানি আমদানি শুরু হয়েছে।
সরকার আশা করছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমে এলে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব সত্ত্বেও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবতা হলো—জনজীবনের ভোগান্তি, রাজনৈতিক চাপ এবং আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আগামী দিনগুলোতে এই তিনটি সংকট কতটা দক্ষতার সঙ্গে সরকার সামাল দিতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে সরকারের জনপ্রিয়তা ও স্থিতিশীলতা।