মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা ‘অসম্ভব’ বলে জানিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অবরোধ এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে হয়। ফলে এর অচলাবস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘প্রকাশ্য’ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের মধ্যে এই নৌপথ চালু করা সম্ভব নয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে “বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করা” এবং ইসরায়েলের পদক্ষেপকে “আগ্রাসন” হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করা দুটি জাহাজ আটক করেছে। পানামার পতাকাবাহী এমএসসি ফ্রানচেসকা এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এপামিনন্দাসকে সন্দেহজনকভাবে প্রণালী ছাড়ার চেষ্টা করার অভিযোগে আটক করা হয়।
একই সময়ে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, হরমুজ এলাকায় একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। একটি ঘটনায় একটি জাহাজের কাছে ইরানি গানবোট গুলি চালালে জাহাজটির ব্রিজ গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই সংঘাত শুরুর পর প্রথমবারের মতো ইরান সরাসরি জাহাজ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরে একটি ইরানি জাহাজে গুলি চালানো এবং একটি তেলবাহী জাহাজে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে সামরিক হামলার হুমকি দিলেও পরে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা প্রস্তুত, সামরিক বাহিনী প্রস্তুত,” যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো, যারা উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানি ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অর্ধেকে নামিয়ে ০.৫ শতাংশে এনেছে। অন্যদিকে গ্রিস অতিরিক্ত ৫০০ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা ঘোষণা করেছে।
গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোটাকিস বলেন, অর্থনীতি এখনো টিকে থাকলেও নিত্যপণ্যের দাম ও জ্বালানি ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
জাতিসংঘের অধীন অর্ন্তজাতিক মেরিটাইম সংস্থা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় প্রায় ২০ হাজার নাবিক ও ২ হাজার জাহাজ আটকে রয়েছে।
সংকট নিরসনে বিভিন্ন দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। পাকিস্তান আলোচনার উদ্যোগ নিলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেনি, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলও এখনো যাত্রা করেনি।
সংঘাত এখন লেবানন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে ইসরায়েল ও ইরানপন্থী হিজবুল্লাহ-এর মধ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে সাংবাদিক আমাল খলিল রয়েছেন। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার প্রস্তুতি চলছে—যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।