একটি সমাধি ঘিরে অসংখ্য বিশ্বাসের গল্প

1776005791-1f40f60176b8c698bc9749660ce74fc9.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক ফিচার ডেস্ক

প্যারিসের আকাশ যখন হালকা ধূসর মেঘে ঢাকা থাকে, তখন শহরটি যেন তার হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকে। কফির কাপে ধোঁয়া ওঠা আর ইতিহাসের নীরবে হেঁটে চলার এই শহরেই অবস্থিত বিখ্যাত ‘পেখ লা শেজ’ সেমিট্রি। এখানে অসংখ্য গুণী মানুষের সাথে নীরবতায় শুয়ে আছেন এক তরুণ ফরাসি সাংবাদিক ভিক্টর নোয়াখ। ১৮৭০ সালের উত্তাল ফ্রান্সে ক্ষমতার লড়াইয়ের বলি হওয়া এই সাংবাদিকের সমাধির সামনে দাঁড়ালে আজ মনে হয়—এখানে মৃত্যু নেই, বরং এক অদ্ভুত জীবনের স্রোত বইছে। পিয়েখ বোনাপাখের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে অকালমৃত্যুর পর নোয়াখ হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদের প্রতীক। তার সেই অসমাপ্ত জীবনের স্মরণে শিল্পী জুল দালু ব্রোঞ্জের এক চমৎকার মূর্তি নির্মাণ করেন, যা আজ নিছক কোনো শিল্পকর্ম নয়, বরং মানুষের গোপন ইচ্ছা পূরণের এক অলৌকিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

শিল্পী দালুর নিপুণ হাতে গড়া এই মূর্তিটি মূলত একজন মানুষের হঠাৎ পড়ে যাওয়ার এক করুণ মুহূর্তকে তুলে ধরে। মাটির ওপর এলিয়ে থাকা শরীর আর পাশে পড়ে থাকা টুপি—সব মিলিয়ে এক অপ্রস্তুত মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি। তবে সময়ের পরিক্রমায় এই সমাধিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় মিথ। মূর্তির দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রোঞ্জের সাধারণ মলিনতার মাঝে কিছু অংশ—বিশেষ করে ঠোঁট এবং প্যান্টের ভাঁজের স্পর্শকাতর স্থানগুলো—অস্বাভাবিকভাবে চকচক করছে। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে যে, এই মূর্তির নির্দিষ্ট অংশে স্পর্শ করলে মনের গোপন বাসনা পূর্ণ হয়। কেউ বিশ্বাস করেন এখানে হাত রাখলে হারানো ভালোবাসা ফিরে আসে, আবার কেউ মনে করেন নিঃসন্তান দম্পতির কোলজুড়ে সন্তান আসে। এমনকি তরুণ-তরুণীদের সম্পর্কের ভাঙন জোড়া লাগাতেও এই মূর্তির অলৌকিক ক্ষমতার ওপর ভরসা করেন অনেকে।

এভাবেই এক সময়ের রাজনৈতিক শহীদের সমাধি আজ ব্যক্তিগত বিশ্বাসের এক অনন্য ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এখানে আসেন, দ্বিধাহীনভাবে মূর্তিকে স্পর্শ করেন এবং মনের আকুতি জানিয়ে ফিরে যান। ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা একজন সাংবাদিক, যার কলম থেমে গিয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে, আজ তিনি মানুষের ভালোবাসা এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণের এক প্রতীকী বাহক। প্যারিসের এই সমাধিটি প্রমাণ করে যে, মানুষ কেবল ইতিহাস মনে রাখে না, বরং তাকে নিজের মতো করে নতুন রূপ দেয়। ভিক্টর নোয়াখের এই দ্বৈত পরিচিতি—একদিকে বিপ্লবী সাংবাদিক আর অন্যদিকে বিশ্বাসের জাদুকর—হয়তো এটাই প্যারিসের আসল সৌন্দর্য, যেখানে মৃত্যু শেষ নয় বরং এক নতুন গল্পের শুরু।

 

Leave a Reply

scroll to top