দেশের শিল্প, ব্যবসা ও বিনিয়োগ খাতে অশনি সংকেত ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সরাসরি উৎপাদন, রফতানি ও বিনিয়োগ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পগুলো গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থাও কমে যাচ্ছে, তারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছেন।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ার প্রভাব পড়েছে রফতানি খাতে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা আট মাস কমেছে রফতানি আয়। এর মধ্যে শুধু মার্চেই আয় কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মার্চ মাসে আয় কমেছে প্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষি ও পাটজাত পণ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সামনের মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি আমদানির অনিশ্চয়তা শিল্প খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে গ্রীষ্মের শুরুতেই দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং শুরু হয়েছে। শহরে যেখানে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে, গ্রামীণ এলাকায় তা বেড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
এতে কৃষি, পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের সংকট শিল্প-কলকারখানার উৎপাদন সক্ষমতাকেও বাধাগ্রস্ত করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ২,০০০ থেকে ২,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। ভারতের আদানি গ্রুপের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিট বন্ধ থাকাও এর অন্যতম কারণ।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
গাজীপুরের এক শিল্প উদ্যোক্তা নাসির উদ্দিন বলেন, বিদ্যুতের ঘাটতিতে উৎপাদন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। সামনে ঈদ, অথচ সময়মতো রফতানি অর্ডার সম্পন্ন করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সাভারের ট্যানারি শিল্পেও একই চিত্র। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে সমস্যা হচ্ছে, যা পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা জানান, জেনারেটর চালিয়ে সীমিত কাজ চালানো গেলেও ভারী যন্ত্রপাতি সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে উৎপাদন কমছে এবং খরচ বাড়ছে।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রতিদিন ৩ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং এখন নিয়মিত ঘটনা। ফলে উৎপাদন ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উদ্যোক্তাদের জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন ১০ টন থেকে কমে ২ টনে নেমে এসেছে বলে জানা গেছে। পল্লী বিদ্যুৎনির্ভর এলাকাগুলোতে চাহিদার তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ কম সরবরাহ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
একই সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় উদ্যোক্তাদের বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, যা পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
উৎপাদন অনিশ্চয়তা ও সময়মতো সরবরাহের ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেক অর্ডার ভারতসহ অন্যান্য প্রতিযোগী দেশে চলে গেছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী জানান, আসন্ন মৌসুমের অনেক অর্ডার এখন অনিশ্চয়তায় রয়েছে। জ্বালানি সংকট আরও বাড়তে পারে—এই আশঙ্কায় ক্রেতারা আগাম অর্ডার স্থগিত করছেন।
পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে খেলাপিতে পরিণত হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে শ্রমিক ছাঁটাই বা বেতন বিলম্বের ঝুঁকিও বাড়বে, যা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, কোরবানির ঈদের আগেই শ্রম অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের মতে, শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে শক্ত বার্তা দিতে হবে—বাংলাদেশ এখনও একটি নির্ভরযোগ্য উৎপাদনকেন্দ্র। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে রফতানি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।