দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়াকে ‘নতুন স্বর্ণযুগের বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর পাকিস্তানে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনায় ইরান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে প্রবেশ করছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সিনিয়র আন্তর্জাতিক বিষয়ক সাংবাদিক জুলিয়ান বোর্জারের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংঘাতের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে ট্রাম্প তাৎক্ষণিক কিছু সাফল্য পেলেও দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক লড়াইয়ে তেহরান টিকে আছে দৃঢ়ভাবে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র আক্রমণের মুখে ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের কৌশলগত সক্ষমতা অটুট রয়েছে। বিশেষ করে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের উল্লেখযোগ্য মজুদ এখনও ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা সংঘাতের মূল ইস্যুগুলোর একটি। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাও দেখিয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন। সম্প্রতি দেওয়া এক বার্তায় তিনি দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথে যুক্তরাষ্ট্র অনেক দূর এগিয়েছে। তার মতে, তেলের দাম কমেছে এবং বিশ্ব শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তবে যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে এখনও ভিন্নমত রয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননসহ সব অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ ও নিরাপদভাবে খুলে দেওয়ার শর্তেই যুদ্ধবিরতি হয়েছে। তবে তেহরান জাহাজ চলাচলে সম্মতি দিলেও তা ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে বলে শর্ত দিয়েছে।
আঞ্চলিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরান ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগির প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি জাহাজ থেকে প্রায় ২০ লাখ ডলার টোল আদায়ের পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রণালির প্রচলিত ‘মুক্ত জলপথ’ ধারণায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
এই অনিশ্চয়তার কারণে উপসাগরে অবস্থানরত বহু জাহাজ এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করছে, তবে নতুন জাহাজ প্রবেশে অনীহা দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ইরানকে টোল প্রদান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে কি না, তা নিয়েও জাহাজ মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, যুদ্ধ চলাকালে ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে কঠোর হুমকি দিলেও তা তেহরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারেনি। বরং আলোচনার ভিত্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের পরিবর্তে ইরানের দেওয়া ১০ দফা পরিকল্পনাই প্রাধান্য পেয়েছে। পূর্বে প্রত্যাখ্যাত সেই প্রস্তাবই পরবর্তীতে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ইরানের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকৃতি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অভ্যন্তরীণ জনমত বিবেচনায় ফারসি সংস্করণে এই অধিকার উল্লেখ থাকলেও ইংরেজি অনুবাদে তা অনুপস্থিত রাখা হয়েছে।
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা তাত্ত্বিকভাবে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা দেয়। এটি আলোচনায় তাদের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর আগে জেনেভায় আলোচনায় ইরান এই মজুদ সমর্পণে আগ্রহ দেখিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনায় ইরান এমন অবস্থান নিয়ে অংশ নেবে, যেখানে তারা দেখাতে পারবে—তীব্র সামরিক চাপের মুখেও তারা টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি সংঘাতের শেষ পর্যায় পর্যন্ত তারা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা আলোচনায় কঠোর অবস্থান নিলেও বাস্তবে তাদের প্রতিপক্ষ যে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ কম। জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা ব্যবহার করে তেহরান ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতে পারে।