কোরিয়া থেকে ইরান: ৭৬ বছরের মার্কিন যুদ্ধের খরচ ও মানবিক মূল্য

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

কোরিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ইরান সংঘাত—প্রায় সাত দশকের বেশি সময় ধরে চলা মার্কিন সামরিক অভিযানের খরচ এখন শুধু অর্থনৈতিক হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো প্রাণহানি, দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব এবং প্রজন্মজুড়ে বহন করা মানসিক ক্ষত।
আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা জেফেরি ক্যাম্প আল জাজিরাকে তার অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন সময়ে তাদের ধুলায় ভরা প্রতিকূল পরিবেশ, চরম আবহাওয়া এবং প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হয়েছে।

২০০৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের মাইদান এলাকায় দায়িত্ব পালন করা জেফেরি বলেন, “আমরা একে ‘মুন ডাস্ট’ বলতাম।” ওই অঞ্চলের সূক্ষ্ম ধুলিকণা ঢুকে পড়ত যানবাহন, সরঞ্জাম এমনকি ফুসফুসেও। প্রখর গরমের শুষ্ক গ্রীষ্ম আর হিমশীতল, ঝোড়ো শীত—সব মিলিয়ে ছিল কঠিন বাস্তবতা। তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্র কখনোই শুধু কৌশলগত বা সামরিক নয়; এটি গভীরভাবে মানবিক। “সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ।”

১৯৮৩ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া জেফেরির বয়স এখন ৬১। তিনি বর্তমানে ফ্লোরিডার সারাসোটায় বসবাস করেন। ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে মোতায়েন হওয়া ৮ লাখ ৩২ হাজার মার্কিন সেনার একজন ছিলেন তিনি। সেখানে যুদ্ধ করার পাশাপাশি সেনাদের সেবার দায়িত্বও পালন করেছেন। তার ভাষায়, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং সেবা ছিল তার কাছে এক ধরনের আহ্বান।

দুই দশকের এই যুদ্ধে ২ হাজার ৪৬১ জন মার্কিন সেনা নিহত হন এবং অন্তত ২০ হাজার আহত হন। জেফেরি বলেন, ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা তাকে যুদ্ধের মানবিক মূল্য সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি দিয়েছে। এটি শুধু মার্কিন সেনাদের জন্য নয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাধারণ মানুষের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। যুদ্ধ কখনোই পরিচ্ছন্ন নয়, আর দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহায় তারা, যারা এই সিদ্ধান্ত নেয় না।

২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ ইরান অভিযানের ৬০ দিন পূর্ণ হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ৩৭৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ১৩ জন সদস্য নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন যুদ্ধে লাখ লাখ বেসামরিক মানুষ এবং হাজার হাজার সেনা নিহত হয়েছেন। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্ট অব ওয়ার প্রজেক্ট’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে সরাসরি প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই ব্যয় হয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। পরবর্তী সময়ে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, দৈনিক ১ বিলিয়ন ডলারের হিসাব কিছুটা বেশি। যুদ্ধের শুরুতে ব্যয় বেশি ছিল, কারণ যুক্তরাষ্ট্র টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ব্যয়বহুল দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যার প্রতিটির দাম প্রায় ২৫ লাখ ডলার। তার হিসাবে, অতিরিক্ত ব্যয়সহ প্রথম ছয় দিনের মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১২.৭ বিলিয়ন ডলার।

তিনি জানান, প্রথম সপ্তাহের পর দৈনিক ব্যয় কমে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে এবং যুদ্ধবিরতির সময় তা ১০০ মিলিয়ন ডলারের নিচে থাকে, কারণ তখন আর অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছিল না। দৈনিক ব্যয়ের দিক থেকে ইরান যুদ্ধ সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সংঘাতগুলোর একটি হতে পারে। তুলনামূলকভাবে, ২০ বছরের আফগান যুদ্ধের মোট ব্যয় ছিল প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০০৩ সালে শুরু হওয়া ৮ বছরের ইরাক যুদ্ধের ব্যয় ছিল প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার।

২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ইরাকে দায়িত্ব পালন করা ওয়াশিংটনভিত্তিক ভেটেরান সংগঠন ‘কমন ডিফেন্স’-এর রাজনৈতিক পরিচালক নাভিদ শাহ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জড়িয়ে পড়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে। তার মতে, ইরানের বর্তমান সংঘাত সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি। তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও বিস্তৃত। এটি ভেটেরানদের শরীর ও মনে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাব ফেলে এবং তাদের পরিবারেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। যারা আর ফিরে আসে না, তাদের পরিবারের জন্য এই শূন্যতা চিরস্থায়ী।

‘কস্ট অব ওয়ার প্রজেক্ট’ বলছে, আগামী ৩০ বছরে ভেটেরানদের স্বাস্থ্যসেবায় যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তত ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে। রয়টার্স/ইপসোসের ১২ এপ্রিলের এক জরিপে দেখা গেছে, ইরানে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে ৬০ শতাংশ আমেরিকান। যুদ্ধের শুরুতে এই হার ছিল ৪৩ শতাংশ। সাধারণত যুদ্ধের শুরুতে জনসমর্থন বাড়ে, কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

ওকলাহোমার বাসিন্দা মারওয়া জাদুন জানান, গত কয়েক মাসে তার ব্যক্তিগত ব্যয় ৩৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেই এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে, ফলে অতিরিক্ত চিকিৎসা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তার অভিযোগ, করের টাকা যুদ্ধের পেছনে ব্যয় হলেও সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

চাকরি হারানোর পর তিনি বেকার ভাতা ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার জন্য আবেদন করেন, কিন্তু সেটিও পর্যাপ্ত নয়। তার প্রশ্ন, যুদ্ধের জন্য অর্থ আছে, কিন্তু সীমিত আয়ের কারণে কেন তিনি প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন না?

আরেকজন সরকারি কর্মীও জানান, ইরান যুদ্ধ তার দৈনন্দিন জীবনে চাপ তৈরি করেছে। জ্বালানি, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে এর প্রভাব পড়ছে।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর প্রায় ২৭.৮ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত চাপ পড়েছে, যা পরিবারপ্রতি গড়ে প্রায় ২০০ ডলার। যুদ্ধের আগে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ছিল ২.৯০ ডলার, যা বেড়ে ৪.১০ ডলারে পৌঁছেছে—প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি।

আরও
© All rights reserved © 2026 24ghantabangladesh
Developer Design Host BD