মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি ও জনসমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা সত্ত্বেও ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং সমসাময়িক দলীয় ভূমিকা নিয়ে বিতর্কে জাতীয় সংসদে ক্রমেই চাপে পড়ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই দলটির ঐতিহাসিক অবস্থান ও অতীত দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ঘনীভূত হয়েছে।
সংসদের ভেতরে সরকারি ও বিরোধী উভয় শিবিরের প্রবীণ নেতাদের সমালোচনায় ১৯৭১ সালের ভূমিকা এবং জামায়াতের ‘ক্ষমা চাওয়া’ ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এর মধ্যেই দলটি এক জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি—একদিকে রাজপথে সক্রিয় উপস্থিতি, অন্যদিকে সংসদে অতীত বিতর্কের চাপ।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ১৯৪৭ থেকে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দলের নানা ভুলের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করলেও এ বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে পরবর্তীতে কোনো স্পষ্ট আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানানো হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে দলটি কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফল ও মাঠপর্যায়ের সমর্থনের ভিত্তিতে জামায়াত নিজেদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও দেশপ্রেমিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তবে সংসদের ভেতরে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে ধারাবাহিক প্রশ্ন তাদের অবস্থানকে জটিল করে তুলছে।
সংসদ সদস্যদের কড়া সমালোচনায় মুক্তিযুদ্ধকে রাষ্ট্রের মৌল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে এবং সেই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের অতীত অবস্থান বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ফলে একদিকে দলটিকে ৫ আগস্ট-পরবর্তী আন্দোলনের রাজনৈতিক অর্জন ধরে রাখার লড়াই করতে হচ্ছে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক দায় ও জবাবদিহির চাপ তাদের কৌশল সীমিত করছে।
জাতীয় সংসদে এই বিতর্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে আওয়ামী লীগের অতীত শাসন ও রাজনৈতিক আচরণের প্রসঙ্গও সামনে আনছে। এতে পাল্টা-বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে শুরু হওয়া এই বিতর্ক সাম্প্রতিক সময়ে আরও তীব্র হয়েছে। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান সংসদে দেওয়া বক্তব্যে ৫ আগস্টের ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, এটি গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ নয়; মুক্তিযুদ্ধ অনেক গভীর ও দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল।
তিনি আরও বলেন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপন করেন, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জিত হয়।
ফজলুর রহমানের বক্তব্যে স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও উঠে আসে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত করতে পারে না—এটি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এর জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কে কোন দল করবে তা নির্ধারণের অধিকার কারও নেই। তিনি দাবি করেন, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক পছন্দ সীমিত করার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই এবং এ ধরনের মন্তব্য নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।
এ সময় ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ জামায়াতের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেন এবং তাদের ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যের কিছু অংশ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তার নামে ভুল বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে। পরে পার্থ বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, উক্তিটি তার ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি।
জামায়াতের সমালোচনা করে বিএনপির নেতা জয়নাল আবদিন ফারুকও তীব্র মন্তব্য করেন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী জামায়াতের অতীত ভূমিকার পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বলেন, ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে দলটি ভূমিকা রেখেছিল এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে জামায়াত নিজেদের ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরতে চায়।
তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এসব দাবি নাকচ করে বলেন, অতীতে ভুলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চাওয়ায় দলটি রাজনৈতিকভাবে চাপে রয়েছে।
ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে জামায়াত পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত। পরবর্তী সময়ে দলটির ভেতর থেকেই এ ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি উঠেছিল।
ডা. শফিকুর রহমান বিভিন্ন সময়ে সতর্ক অবস্থান নিলেও সংসদে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। নিউইয়র্কে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দলের ভুলের জন্য একাধিকবার ক্ষমা চাওয়ার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, কোনো সিদ্ধান্তের কারণে জাতির ক্ষতি হলে ক্ষমা চাইতে দ্বিধা নেই।
তবে এ বক্তব্যের পরও দলটি আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্ট করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমা না চাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক কৌশল কাজ করেছে। এতে সমর্থক হারানোর আশঙ্কা, অতীত বিচার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন এবং জোট রাজনীতির বাস্তবতা বিবেচনায় ছিল। ফলে বিষয়টি দীর্ঘদিন অনির্ধারিত রাখা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত নিজেদের একটি পরিবর্তিত ও তুলনামূলকভাবে উদার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বার্তা দিয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ার উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে।
তবুও সংসদে চলমান সমালোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ঘিরে বিতর্ক এখনো তাদের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কারণ একাত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর ও সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর গোলাম হাফিজের মতে, ভবিষ্যতে জামায়াতের রাজনীতি শুধু জনসমর্থনের ওপর নির্ভর করবে না; ১৯৭১ সালের প্রশ্নে স্বচ্ছ অবস্থান এবং অনুতাপ প্রকাশের আন্তরিকতাও তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।