আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট দেশের শাসন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ মোড় আনতে পারে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের ফলাফলের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনের পথে দেশ এগোবে কি না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই গণভোট শুধু মতামত প্রকাশের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক সংস্কারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবে।
১২ ফেব্রুয়ারি ভোটারদের সামনে প্রশ্ন থাকবে—জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংশোধন প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে তারা ‘হ্যাঁ’ না ‘না’ ভোট দেবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভোটের ফল বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদের কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ধরন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধানে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তনের পথ খুলবে। তখন নতুন সংসদ শুধু আইন প্রণয়নই নয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের সংস্কার বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে এবং এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে হয়।
জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী, সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), মহাহিসাব নিরীক্ষক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য একটি বাছাই কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই কমিটিতে সরকারি দল, বিরোধী দল এবং প্রয়োজনে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিও থাকবেন। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন।
এ ছাড়া একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন এবং একই সঙ্গে দলের প্রধানের পদে থাকতে পারবেন না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা কমবে।
বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, এই ধারা নিয়ে তাদের কিছু ভিন্নমত থাকলেও প্রাথমিক আলোচনায় কিছু সমঝোতা হয়েছে।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করেন। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতি মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন। এতে রাষ্ট্রপতির স্বাধীনতা বাড়বে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য শক্তিশালী হবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সংস্কার বাস্তবায়িত হলে শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা ভাঙবে।
জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে। উচ্চকক্ষ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে গঠিত হবে, ফলে কোনো একটি দলের একক আধিপত্য কমবে।
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন হবে। অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবেন। পাশাপাশি চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের হাতে থাকবে।
একজন সাবেক সংসদ সদস্য বলেন, এতে সরকারি দলের একক আধিপত্য কমবে এবং সংসদে জবাবদিহি ও সমন্বয় বাড়বে।
সংবিধান সংশোধনের জন্য তিনটি ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে।
১. রাষ্ট্রপতির আদেশ (২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি হয়েছে)
২. গণভোটের মাধ্যমে প্রস্তাবের বৈধতা যাচাই
৩. নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়ন
গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। তখন সংস্কারের বিষয়টি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
সংস্কার বাস্তবায়িত হলে নির্বাচন কমিশন, দুদক, মহাহিসাব নিরীক্ষক এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে এবং ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরবর্তীতে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুদক, পুলিশ ও জনপ্রশাসন খাতে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।
প্রাথমিকভাবে ১৬৬টি সুপারিশ চিহ্নিত করা হয়। পরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংশ্লিষ্ট। এসব প্রস্তাব জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংস্কার বাস্তবায়িত হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সংক্রান্ত বিধান, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে প্রকৃত সংস্কার বাস্তবায়নের পথ খুলবে। অন্যদিকে ‘না’ জয়ী হলে সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং দেশ আবার পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মূল দাবি ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন, সংস্কার এবং বিচার। শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন, যা জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।