মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বিমান চলাচলে। ওই অঞ্চলের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় যুদ্ধের পঞ্চম দিন পর্যন্ত ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী অন্তত ১৭৩টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার যাত্রী ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রবাসী শ্রমিক ও সৌদি আরবে ওমরা পালন করতে যাওয়া বাংলাদেশিরা।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৯০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালিত হয়। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। ফলে ওই অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত বহু ফ্লাইট স্থগিত হয়ে যায়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) কাওসার মাহমুদ জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৩টি, ১ মার্চ ৪০টি, ২ মার্চ ৪৬টি, ৩ মার্চ ৩৯টি এবং ৪ মার্চ ২৫টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচ দিনে মোট ১৭৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
বর্তমানে সৌদি আরবের জেদ্দা, মদিনা ও রিয়াদ এবং ওমানের মাস্কাটে ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে আবুধাবি, শারজাহ, দুবাই, দোহা, কুয়েত ও দাম্মাম রুটের ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।
ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রবাসী শ্রমিকরা। অনেকেই নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারায় তাদের ভিসা ও আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার ছুটিতে দেশে এসে আটকে পড়া অনেক শ্রমিক চাকরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিদারুল হক আট বছর ধরে সৌদি আরবের জেদ্দায় একটি কোম্পানিতে কাজ করছেন। তিন মাস আগে ছুটিতে দেশে এসে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় নির্ধারিত দিনে যেতে পারেননি তিনি। পরে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে ৫৫ হাজার টাকায় নতুন টিকিট কেটে জেদ্দা যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেখান থেকে তাকে সড়কপথে দাম্মাম যেতে হবে।
শুধু প্রবাসী শ্রমিকই নন, সৌদি আরবে ওমরা পালন করতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশিও এখন দেশে ফিরতে পারছেন না। বিশেষ করে যারা দুবাই, আবুধাবি বা কুয়েত হয়ে ট্রানজিটে সৌদি আরব গিয়েছিলেন, তাদের ফেরার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। মক্কা, মদিনা ও জেদ্দায় হাজারো বাংলাদেশি ওমরা যাত্রী এখন হোটেল ভাড়া, খাবার ও ভিসার মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা জহির উদ্দিন গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ফ্লাই দুবাইয়ের মাধ্যমে সৌদি আরব যান ওমরা পালনের জন্য। তার ২ মার্চ ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু জেদ্দা বিমানবন্দরে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে। ফলে তিনি এখন সৌদিতেই আটকা পড়ে আছেন।
এদিকে সংকট মোকাবিলায় কিছু বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুবাই ও আবুধাবি রুটে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি পেয়েছে বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। এসব ফ্লাইটে বিশেষ করে যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বা শেষ হওয়ার পথে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় দুবাই ও আবুধাবি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কয়েকটি এয়ারলাইন্সকে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে। এতে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের ধাপে ধাপে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, স্থগিত থাকা রুটগুলোর যাত্রীরা চাইলে কোনো অতিরিক্ত চার্জ ছাড়াই টিকিট রিফান্ড করতে পারবেন বা বিনামূল্যে ভ্রমণের তারিখ পরিবর্তন করতে পারবেন।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং মানবিক সংকটের ঝুঁকি বাড়তে পারে।