দেশের রাজস্ব খাত বর্তমানে বড় ধরনের চাপে রয়েছে। প্রধান রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতির মুখে পড়েছে।
জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা—যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
যদিও এ সময়ে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তবে তা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। তিনটি প্রধান খাত—আয়কর, আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট)—কোনোটিতেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে আয়কর খাতে, যেখানে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা। আমদানি শুল্কে ঘাটতি ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা এবং ভ্যাট খাতে প্রায় ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যের শ্লথগতি, আমদানি কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ঋণের শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশকে প্রতিবছর জিডিপির অন্তত অতিরিক্ত ০.৫ শতাংশ সমপরিমাণ রাজস্ব বাড়াতে হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজস্ব খাতে প্রস্তাবিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এনবিআর বিলুপ্ত করে নতুন কাঠামো তৈরির অধ্যাদেশ এখনও আইনে পরিণত হয়নি, ফলে সংস্কার কার্যত থমকে আছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও রাজস্ব সংস্কার কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আবদুল মজিদের মতে, বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে এত বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাস্তবসম্মত নয়। নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন একই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকায় জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হয় বলেও তিনি মনে করেন।
চলতি অর্থবছরের বাকি তিন মাস—এপ্রিল, মে ও জুন—এনবিআরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এ সময়ের মধ্যে আদায় করতে হবে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৭১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা।
তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়নি। সর্বোচ্চ আদায় হয়েছিল জানুয়ারিতে ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা এবং সর্বনিম্ন আগস্টে ২৭ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে রাজস্ব আদায়ে চাপ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক বাণিজ্যের ধীরগতি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে, যার সরাসরি প্রতিফলন পড়েছে রাজস্ব খাতে।
তাদের মতে, করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, স্বেচ্ছা কর প্রদানে উৎসাহ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই টেকসই সমাধান সম্ভব।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো—রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং একই সঙ্গে অর্থনীতির গতিশীলতা ধরে রাখা। কারণ অতিরিক্ত করচাপ ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে, এই রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতি দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও বাস্তবায়ন ঘাটতির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। সময়োপযোগী সংস্কার ছাড়া এ সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।