বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের পোড়াদহ এলাকায় ইছামতী নদীর তীরে প্রতি বছর বসে এক ব্যতিক্রমধর্মী লোকজ উৎসব—পোড়াদহ মেলা। এটি ‘জামাই মেলা’ নামেও পরিচিত। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী মাঘ মাসের শেষ বুধবার দিনব্যাপী এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। শতাব্দীপ্রাচীন এই আয়োজনকে ঘিরে অন্তত ১০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়, যার বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে মাছ।
একদিনের জামাই মেলা শেষ হলেও এর আবহ থেকে যায় আরও কয়েকদিন। পরদিন সকালে একই মেলা প্রাঙ্গণে বসে আরেকটি ব্যতিক্রমী আয়োজন—‘বউ মেলা’। এই মেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ক্রেতাদের প্রায় সবাই নারী এবং দোকানদার ছাড়া পুরুষদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকে। নারীদের স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটার সুযোগ করে দিতেই এ ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছে।
বউ মেলায় রেশমি চুড়ি, আলতা, চিরুনি, হাঁড়ি-পাতিল, খুন্তি-কড়াই, পানের বাটা, প্রসাধনী, খেলনা ও মিষ্টান্নসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই মেলা বসছে এবং দিনভর নারীদের ঢলে মুখর থাকে পুরো এলাকা।
জামাই মেলাকে ঘিরে এই অঞ্চলে একটি বিশেষ সামাজিক রেওয়াজ গড়ে উঠেছে। আশপাশের গ্রামগুলোতে মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনি ও আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত দেওয়া হয়। জামাইরা মেলা থেকে বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়িতে যান, সেই মাছ রান্না করে আপ্যায়ন করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নানা পিঠা-পুলি। ফলে অনেকেই মেলাটিকে ‘জামাই মেলা’ নামে ডাকতে শুরু করেন।
মেলা প্রাঙ্গণে সারি সারি দোকানে বড় বড় মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। ভোর থেকেই ক্রেতাদের ভিড়ে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ইছামতী, করতোয়া, যমুনা ও বাঙ্গালী নদী থেকে ধরা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এখানে বিক্রি হয়। বাগাড়, রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, পাঙাশ, আইড়, চিতলসহ নানা মাছের সমাহার দেখা যায়। আগে বিশাল আকারের বাগাড় মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা কমে গেছে।
মেলায় মাছ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টির দোকান বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করে। মাছ আকৃতির বড় মিষ্টি এখানে অন্যতম আকর্ষণ, যা এক কেজি থেকে ১২ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এছাড়া রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম, সন্দেশ, জিলাপি, লাড্ডু, খই, মুড়ি, তিলের নাড়ুসহ নানা মিষ্টান্ন বিক্রি হয়।
পোড়াদহ মেলার ইতিহাস সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হয়, এটি অন্তত ৪০০ বছর পুরোনো। জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় মরা বাঙ্গালী নদীতে মাঘ মাসের শেষ বুধবার অলৌকিকভাবে একটি বড় কাতলা মাছ ভেসে উঠত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষ সেখানে জড়ো হতে শুরু করে। পরে এক সন্ন্যাসীর নির্দেশনায় সেই মাছের উদ্দেশে অর্ঘ্য নিবেদন করা শুরু হয়, যা ‘সন্ন্যাসী পূজা’ নামে পরিচিতি পায়। ধীরে ধীরে এই পূজাকে কেন্দ্র করে মেলা বসতে শুরু করে।
পরবর্তীতে স্থানটির নাম অনুসারে এটি ‘পোড়াদহ মেলা’ নামে পরিচিত হয়। আর মেলা উপলক্ষে জামাইদের নিমন্ত্রণের রেওয়াজ চালু হওয়ায় এটি ‘জামাই মেলা’ নামেও পরিচিতি পায়।
মেলায় শুধু কেনাবেচাই নয়, বিনোদনেরও নানা আয়োজন থাকে। নাগরদোলা, মিনি ট্রেন, ঘোড়ার গাড়ি, সার্কাস, মোটরসাইকেল খেলা, যাত্রাপালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মেলাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। শিশুদের খেলনা, কাঠের আসবাব, লোহা ও স্টিলের জিনিসপত্র, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসে।
গাবতলীর মহিষাবান গ্রামের মন্ডল পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই মেলা পরিচালনা করে আসছে। বর্তমান আয়োজক কমিটির সভাপতি আবদুল মজিদ মন্ডল জানান, মেলার জনপ্রিয়তা এখনও আগের মতোই রয়েছে। একদিনের মেলা হলেও এর প্রভাব থাকে অন্তত সপ্তাহজুড়ে। বউ মেলায় একদিনেই প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কেনাবেচা হয়, আর পুরো আয়োজন মিলিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়।
তিনি আরও জানান, নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে কেনাকাটার সুযোগ দিতে বউ মেলায় পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ রাখা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা করে থাকে।
তবে চলতি বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে নির্ধারিত দিনে এই ঐতিহ্যবাহী মেলার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
সব মিলিয়ে, পোড়াদহের এই মেলা শুধু একটি কেনাবেচার কেন্দ্র নয়—এটি একটি সামাজিক উৎসব, যেখানে ঐতিহ্য, বিশ্বাস, সম্পর্ক ও আনন্দ মিলেমিশে এক অনন্য সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। এখানে যেমন রয়েছে অর্থনৈতিক লেনদেন, তেমনি আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা গ্রামীণ জীবনের আবেগ ও বন্ধনের গল্প।





