২০০ বছরের পৌষ মেলার অজানা কাহিনি

28e20106b7cd2c3426274c024ce7d1ff-69dd2334e29f5.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক

শেরপুর পৌরসভার নবীনগর এলাকায় প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা। প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মেলা পৌষ সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে বসে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোরো ধান আবাদকে সামনে রেখে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের আগেই মেলার আয়োজন করা হয়। দীর্ঘদিনের এই মেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা জনশ্রুতি ও অজানা কাহিনি।

স্থানীয়দের বিশ্বাস, নবীনগর এলাকায় প্রায় তিন একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছাওয়াল পীরের দরগাকে কেন্দ্র করেই এই মেলার সূচনা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই আয়োজনের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস না থাকলেও লোকমুখে প্রচলিত নানা গল্পই মেলার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

নবীনগরের প্রবীণ বাসিন্দা, আইনজীবী ও সাংবাদিক ফকির আকতারুজ্জামান বলেন, তার জানা মতে, এই মেলার সূচনা ঠিক কবে হয়েছে তা নির্দিষ্টভাবে বলা না গেলেও পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া ধারাবাহিকতার কারণেই এখনো এটি টিকে আছে। তিনি জানান, ছাওয়াল পীরের আগমন ও তাঁর কবরকে কেন্দ্র করেই মেলার শুরু হয়েছে বলে প্রচলিত রয়েছে।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, ছাওয়াল পীর মূলত ঈশ্বরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর অনুসারীরা মরদেহ নিয়ে এমন একটি জায়গা খুঁজছিলেন, যেখানে কবরটি উত্তর-দক্ষিণমুখী না হয়ে ভিন্নভাবে দেওয়া যাবে। বিভিন্ন স্থানে চেষ্টা করেও সফল না হয়ে তারা নবীনগরে আসেন। প্রথমে উত্তর-দক্ষিণমুখী করে কবর খোঁড়ার চেষ্টা করলে মাটি ধসে পড়ে। পরে পূর্ব-পশ্চিমমুখী করে কবর খনন করলে আর কোনো সমস্যা হয় না এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে সেই কবরস্থানকে কেন্দ্র করেই দরগা গড়ে ওঠে এবং শুরু হয় পৌষ মেলা।

আরেকটি প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এক কৃষক ছাওয়াল পীরের কবরসংলগ্ন জমিতে হালচাষ করছিলেন। এ সময় বারবার মইয়ের রশি ছিঁড়ে যাচ্ছিল। বিরক্ত হয়ে তিনি মানত করেন—যদি আর রশি না ছিঁড়ে, তাহলে পীরের মাজারে শিন্নি দেবেন। এরপর আর রশি ছিঁড়ে না। কিন্তু পরে তিনি মানত পূরণ করতে ভুলে যান। এক রাতে স্বপ্নে ছাওয়াল পীর তাকে বলেন, মইয়ের রশি ধরে রাখতে গিয়ে তাঁর হাতে ফোসকা পড়েছে। তখন কৃষক বিষয়টি বুঝতে পেরে পরদিনই শিন্নি দেন। এরপর থেকে মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে মানত নিয়ে আসতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এই স্থানটি হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের কেন্দ্র, আর তার পাশেই গড়ে ওঠে পৌষ মেলা।

বর্তমানে ছাওয়াল পীরের দরগার পাশে রোয়া বিলের তীরে বড় পরিসরে বসে এই মেলা। এতে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবারের বিশাল সমাহার দেখা যায়। মুড়ি, মুড়কি, মোয়া, সাজ, নিমকি, গজা, খোরমা, বাদাম, কটকটি, তিলের খাজা, চানাচুরসহ নানা মুখরোচক খাবারের পসরা নিয়ে বসেন বিক্রেতারা। এছাড়া স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের তৈরি খেলনা ও তৈজসপত্র, শিশুদের খেলনা, নারীদের প্রসাধনী ও চুড়ি-মালার দোকানও মেলায় বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করে।

পৌষ মেলাকে কেন্দ্র করে শেরপুর শহরসহ আশপাশের এলাকা থেকে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও শিশু-কিশোরদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।

একসময় এই মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা ও গাঙ্গি খেলা। আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঘোড়সওয়াররা অংশ নিতে আসতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব আয়োজনের জৌলুস কিছুটা কমে এসেছে।

ফকির আকতারুজ্জামান বলেন, এই মেলা তাদের কাছে শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি সামাজিক উৎসব। আগে বাড়ি বাড়ি উৎসবের আমেজ বিরাজ করত, আত্মীয়-স্বজনদের আনাগোনায় এলাকা মুখর থাকত। এখন সেই আনন্দ কিছুটা কমে গেলেও পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এই আয়োজন চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও মনে করেন, একটি স্থায়ী মেলা আয়োজন কমিটি থাকলে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবকে আরও সুসংগঠিত ও প্রাণবন্ত করা সম্ভব।

 

Leave a Reply

scroll to top