ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যখন বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই নাটকীয়ভাবে ঘোষণা আসে যুদ্ধবিরতির। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘একটি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি, অন্যদিকে আড়ালে থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সমঝোতার সবুজ সংকেত—এই টানাপোড়েনে রুদ্ধশ্বাস কূটনৈতিক তৎপরতার সাক্ষী হয় বিশ্ব।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস ১১ জন সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এই সমঝোতার নেপথ্য কাহিনি তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সোমবার থেকেই পর্দার আড়ালে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন শুরু হয়। ইসরায়েলি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো মোজতবা খামেনি আলোচকদের চুক্তির দিকে এগোতে নির্দেশ দেন। একটি আঞ্চলিক সূত্র জানায়, তার অনুমোদন ছাড়া এই সমঝোতা সম্ভব হতো না।
ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কার মধ্যে খামেনি অত্যন্ত গোপনে বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে আলোচনার তদারকি করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো তার এই সিদ্ধান্তকে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে উল্লেখ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি একদিকে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডারদের সম্মত করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
সোমবার হোয়াইট হাউসে ইস্টার উদযাপনের মধ্যেই আড়ালে চলছিল উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা। ইরানের পক্ষ থেকে পাঠানো ১০ দফার প্রস্তাব দেখে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ সেটিকে ‘একটি বিপর্যয়’ বলে মন্তব্য করেন। এরপর শুরু হয় সংশোধনী ও পাল্টাপাল্টি খসড়া বিনিময়।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উইটকফ ও আরাঘচির মধ্যে দিনভর টানটান আলোচনা চলে, যেখানে বারবার খসড়া পরিবর্তন করা হয়। মিসর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও এই অচলাবস্থা কাটাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
মঙ্গলবার সকালে যখন অগ্রগতির আভাস মিলছিল, তখনই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন, ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা হারিয়ে যাবে।’ এর পরপরই পেন্টাগন ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী ইরানের অবকাঠামোতে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত অনিশ্চিত ও উত্তেজনাপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেন।
এই পরিস্থিতিতেই ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স হাঙ্গেরি থেকে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার দুপুরে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে পক্ষগুলো সম্মত হয়। ট্রাম্পের ঘোষণার মাত্র ১৫ মিনিট পর মার্কিন বাহিনীকে হামলা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আগামী শুক্রবার পাকিস্তানে এ বিষয়ে পরবর্তী দফা আলোচনায় জে ডি ভ্যান্স নেতৃত্ব দিতে পারেন বলে জানা গেছে। তবে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে, যাতে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ও প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট শিগগিরই এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানা গেছে। সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করতে পারে, তাদের কঠোর অবস্থানের ফলেই এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে।