কী আছে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশের ভাগ্যে?

২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ রিপোর্ট
  • সর্বশেষ আপডেট : মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬

চব্বিশের জুলাই–আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিদায় নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। পরবর্তীতে ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নেয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের শপথের মাধ্যমে সেই অন্তর্বর্তী সরকারের অবসান ঘটে।

তবে প্রায় ১৮ মাসে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে নতুন আইন প্রণয়ন, বিদ্যমান আইনের সংশোধন, এমনকি নীতিনির্ধারণীমূলক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও।

কী ছিল এসব অধ্যাদেশে?

উল্লেখযোগ্য অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন, যার মাধ্যমে বিচারপরিধি সম্প্রসারণ করা হয়। সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের জন্য ‘সুপ্রিম কোর্ট জাজেস অ্যাপয়েন্টমেন্ট অর্ডিন্যান্স’ জারি করা হয় এবং এর ভিত্তিতে একাধিক নিয়োগও সম্পন্ন হয়।

এছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং তা নিয়ে গণভোট আয়োজন করা হয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে। এ গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং বিষয়টি উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো গঠনে ‘বিচার বিভাগীয় সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশও জারি করা হয়—যা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তি দিতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ’ জারি নিয়েও মতভেদ রয়েছে।

এছাড়া গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ, সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে নতুন সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন, জাতীয় আইনগত সহায়তা আইন পরিবর্তন, বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধনসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তন আনা হয়েছে অধ্যাদেশের মাধ্যমে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১৭টি, ২০২৫ সালে ৮০টি এবং ২০২৬ সালে ৩৬টি—মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর মধ্যে ৯২টি ছিল বিদ্যমান আইনের সংশোধনী, তিনটি পূর্ববর্তী আইন রহিতকরণ এবং ৩৮টি ছিল নতুন আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত।

সংবিধান কী বলছে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে গেলে বা অধিবেশন না থাকলে রাষ্ট্রপতি জরুরি পরিস্থিতিতে অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। তবে এসব অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থাপন করতে হয় এবং উপস্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে কার্যকারিতা হারায়।

সংবিধান আরও স্পষ্ট করেছে, অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তন বা রহিত করা যাবে না।

সামনে কী হতে পারে?

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সব ১৩৩টি অধ্যাদেশ বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে। সংসদ চাইলে এগুলো অপরিবর্তিতভাবে পাস করতে পারে, সংশোধন করে নতুন আইন প্রণয়ন করতে পারে, অথবা বাতিল করতে পারে। পাস না হলে নির্ধারিত সময় পর সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে লোপ পাবে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, এসব অধ্যাদেশের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে সংসদের ওপর। তবে অধ্যাদেশের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আইনি বিতর্ক তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন মনে করেন, অধ্যাদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় গৃহীত পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কম।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ মনে করেন, সংসদে পাস হলেও বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ যে কোনো আইন সংবিধানসম্মত কি না—তা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে উচ্চ আদালত।

সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে সংসদের সিদ্ধান্ত ও সম্ভাব্য বিচারিক ব্যাখ্যার ওপর।

 

আরও
© All rights reserved © 2026 24ghantabangladesh
Developer Design Host BD