হরমুজ প্রণালীতে ডলারের আধিপত্যকে লক্ষ্যবস্তু করছে ইরান ও চীন

২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ রিপোর্ট
  • সর্বশেষ আপডেট : বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

নতুন কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বুধবার দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে।

এই পরিস্থিতিতে ইরান ও চীন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে সামনে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা।

দীর্ঘদিন ধরেই তারা অভিযোগ করে আসছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের প্রভাব ব্যবহার করে ওয়াশিংটন প্রতিপক্ষ দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যার মধ্যে ইরান ও চীনও রয়েছে। বিশ্ব তেলবাজারে এই আধিপত্য বিশেষভাবে দৃশ্যমান। ২০২৩ সালে জেপি মরগান চেজের এক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন ডলারে সম্পন্ন হয়।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এই প্রণালীতে ইরানের ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণের কারণে তেহরান ও বেইজিং চীনা ইউয়ানকে বিকল্প মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেখছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান কার্যত ‘টোল বুথ’ পদ্ধতিতে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ইউয়ানে ফি নেওয়ার চেষ্টা করছে, যা চীন-ইরান অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর হওয়ার সাম্প্রতিক ইঙ্গিত। কতগুলো জাহাজ ইউয়ানে অর্থ পরিশোধ করেছে তা স্পষ্ট নয়, তবে ২৫ মার্চ পর্যন্ত অন্তত দুটি জাহাজ এভাবে অর্থ দিয়েছে বলে লয়েডস লিস্ট জানিয়েছে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টির ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে, জিম্বাবুয়েতে ইরানের দূতাবাস এক পোস্টে বৈশ্বিক তেলবাজারে ‘পেট্রোইউয়ান’ চালুর আহ্বান জানিয়েছে।

যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে প্রণালীতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও এ বিষয়ে ইরান ও চীন আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করেনি।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ বলেন, একদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতীকীভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায়, অন্যদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে ইউয়ানকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, চীন ধীরে ধীরে নিজস্ব বাণিজ্য এবং ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর লেনদেন ইউয়ানে রূপান্তরের চেষ্টা করছে।

ইরান ও চীনের জন্য ইউয়ানের ব্যবহার দ্বিমুখী সুবিধা তৈরি করছে। এতে ডলারনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে লেনদেন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়ানো সহজ হয়, পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যও আরও সহজ ও কম ব্যয়বহুল হয়। ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তির পর দুই দেশের বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

যুক্তরাজ্যের কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বুলেন্ট গোকাই বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক আধিপত্যের গুরুত্ব বোঝে এবং ডলার ও পেট্রোডলার ব্যবস্থার বিকল্প খুঁজতে আগ্রহী।

চীনের জন্য এই উদ্যোগ ‘বহুমেরু’ আর্থিক বিশ্ব গঠনের লক্ষ্যে সহায়ক, যেখানে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর প্রভাব বাড়বে এবং ডলারের একক আধিপত্য কমবে। চীন ইরানের তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে এবং ধারণা করা হয়, এর বড় অংশই ইউয়ানে লেনদেন হয়। একই সময়ে ইরান চীন থেকে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, রাসায়নিক পদার্থ ও শিল্প উপকরণ আমদানি করে।

বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ সংস্থার মতে, যুদ্ধ চললেও দুই দেশের মধ্যে তেল বাণিজ্য প্রায় স্বাভাবিক রয়েছে। সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহে ইরান ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৩৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে, যার বেশিরভাগই গেছে চীনে।

চীন দীর্ঘদিন ধরেই ডলারের বিকল্প হিসেবে ইউয়ানকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালে এক ভাষণে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর এবং এটিকে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আশা প্রকাশ করেন।

তবে ইউয়ান এখনও ডলারের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। এটি পুরোপুরি রূপান্তরযোগ্য নয় এবং চীনের কঠোর মূলধন নিয়ন্ত্রণের কারণে আন্তর্জাতিক লেনদেনে এর ব্যবহার সীমিত। পাশাপাশি আর্থিক খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণের কারণে স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের প্রায় ৫৭ শতাংশ ডলারে, যেখানে ইউরোর অংশ প্রায় ২০ শতাংশ এবং ইউয়ানের মাত্র ২ শতাংশ। ২০২৪ সালে সীমান্তপারের বাণিজ্যের মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ ইউয়ানে সম্পন্ন হয়েছে, যদিও ২০১২ সালে এ হার ১ শতাংশেরও কম ছিল।

ন্যাটিক্সিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, এটি বিশ্বকে পুরোপুরি ডি-ডলারাইজ করবে না, তবে ধীরে ধীরে বিকল্প ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করে তুলবে। তিনি আরও বলেন, ডলার নির্ভরতা কমাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ, যারা দীর্ঘদিন ধরে তেলের দাম ডলারে নির্ধারণ করে আসছে।

ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক হোসুক লি-মাকিয়ামা বলেন, চীন ইরানের প্রধান তেল ক্রেতা এবং একই সঙ্গে বড় সরবরাহকারী হওয়ায় ইউয়ানভিত্তিক বাণিজ্য বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে।

ডিফারেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান স্টেইনবক বলেন, স্বল্পমেয়াদে বড় পরিবর্তন না এলেও ইউয়ানের ব্যবহার ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট খাতে মার্কিন প্রভাব কমাতে পারে। এটি হঠাৎ পরিবর্তন নয়, বরং ধীরে ধীরে ক্ষয়ের প্রক্রিয়া।

কেনেথ রোগফ বলেন, ভবিষ্যতের চিত্র অনেকটাই নির্ভর করছে এই সংঘাতের ফলাফলের ওপর। ইরান ও চীন সফল হলে আরও দেশ ডলার নির্ভরতা কমাতে আগ্রহী হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে ডলারের আধিপত্য আরও কিছুদিন বজায় থাকবে।

 

আরও
© All rights reserved © 2026 24ghantabangladesh
Developer Design Host BD