নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশন শুরু হয়েছে এক অস্থির বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে। উদ্বোধনী দিনে সবার নজর ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে। দীর্ঘদিনের রীতি অনুযায়ী ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার বক্তব্যের পরই ট্রাম্প মঞ্চে আসেন। তাঁর ভাষণে সবচেয়ে জোর দিয়ে বলা হয় গাজায় চলমান যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। ট্রাম্প সরাসরি ঘোষণা করেন, “গাজায় যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ করতে হবে, এটিকে থামাতে হবে।”
তিনি দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টার সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আছেন এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। যদিও তিনি ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত, ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, হামলা ও প্রতিশোধের চক্র থামাতে হবে এবং জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা এখন জরুরি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৬৫ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বক্তব্য বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জাতিসংঘকে তিনি কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, সংস্থাটি যুদ্ধ থামানোর পরিবর্তে শুধু ফাঁকা বুলি ছুঁড়ে দেয়। অভিবাসন ইস্যুতে ট্রাম্প জাতিসংঘকে পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, “উন্মুক্ত সীমান্তের এই ব্যর্থ পরীক্ষা শেষ করার সময় এসেছে।” এ সময় তিনি লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের বিরুদ্ধে শরিয়া আইন চালুর চেষ্টার অভিযোগও তোলেন।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে ট্রাম্প তাঁর পুরোনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি একে “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণা” আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি কেবল ভয় সৃষ্টির হাতিয়ার, বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। নিজের ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন, আট মাসে তিনি সাতটি সংঘাত থামানোর উদ্যোগ নিয়েছেন, তবে ইউক্রেন যুদ্ধ ও গাজা সংকট সমাধানে এখনো সফল হতে পারেননি। তবুও তিনি দাবি করেন, তাঁর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির পুনর্জাগরণ ঘটছে।
ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের কটাক্ষ করে বলেন, তারা এখনও রাশিয়া থেকে তেল কিনছে। পাশাপাশি চীন ও ভারতকে অভিযুক্ত করে জানান, “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রধান অর্থদাতা হচ্ছে চীন ও ভারত।” তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞারও হুমকি দেন।
জাতিসংঘ অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য এ বছর—“শান্তি, টেকসই উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষায় ৮০ বছরের বেশি সময় ধরে একসঙ্গে পথচলা।” অধিবেশনের শুরুতে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন, পরে বক্তব্য দেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা। তাঁর পরেই ট্রাম্পের ভাষণকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে গাজা সংকট।
ট্রাম্পের বক্তব্যে জাতিসংঘ, অভিবাসন ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও তিনি নিজেকে বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে সচেষ্ট ছিলেন। অধিবেশনের প্রথম দিনে ট্রাম্প ছাড়াও বক্তৃতা দেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। আগামী দিনগুলোতে বক্তব্য দেবেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
ভাষণের শেষভাগে ট্রাম্প জাতিসংঘের বিকল্প ধারণা হিসেবে “ইউক্রেসি” বা জাতিরাষ্ট্রতন্ত্রের প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, প্রতিটি জাতিরাষ্ট্র নিজস্ব স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে—এমন একটি বিশ্বব্যবস্থাই শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হবে।