সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভুয়া ফটোকার্ডকে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগ থানায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় ডাকসুর শিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের এবং সাহিত্য সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদসহ কয়েকজন মারধরের শিকার হন।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির অন্তত ১০ জন সদস্য আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার পর এসব ঘটনা ঘটে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় একটি ভুয়া এআই ফটোকার্ডের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে। স্ক্রিনশটটি ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির প্যানেল থেকে কার্যনির্বাহী সদস্য পদপ্রার্থী শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর কনটেন্ট ছিল।
এ ঘটনার পর ছাত্রদল নেতারা এর তীব্র সমালোচনা করেন এবং মাহমুদকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তবে মাহমুদ তার আইডি থেকে এমন কোনো পোস্ট না দেওয়ার দাবি করেন এবং বলেন, তার নামে ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়ানো হয়েছে। এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, “ছাত্রলীগ আমার নাম ব্যবহার করে এডিট করা একটি নোংরা ফটোকার্ড ছড়িয়েছে। আবার ছাত্রদলের কিছু কর্মী আমাকে হত্যার হুমকিও দিচ্ছে।”
ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা রিউমার স্ক্যানারের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, মাহমুদের নামে ছড়ানো স্ক্রিনশটটি সম্পাদিত এবং আসল নয়।
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে মাহমুদ শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে সেখানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও জড়ো হন এবং তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রদল নেতারা থানার একটি কক্ষে প্রবেশের সময় সাংবাদিকরা ভিডিও ধারণ করতে চাইলে তাদের বাধা দেওয়া হয়। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মনজুর হোসাইন মাহি জানান, দুই সাংবাদিককে ভিডিও করতে বাধা দিলে তিনি প্রতিবাদ করেন। এ সময় তাকে ধাক্কা দেওয়া হয় এবং পরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে সাংবাদিকদের মারধর করা হয়।
অন্যদিকে ছাত্রদল নেতাদের দাবি, তারা ঘটনাটিকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ উল্লেখ করে ভিডিও ধারণ না করার অনুরোধ করেছিলেন। পরে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এ সময় ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের এবং সাহিত্য সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী থানায় গেলে তাদের লক্ষ্য করে ‘গুপ্ত শিবির’ স্লোগান দেওয়া হয়। এরপর তাদের ওপর হামলা চালানো হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মুসাদ্দিক আলীকে মারধর করতে করতে থানার ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ সময় কয়েকজন নেতা তাকে রক্ষার চেষ্টা করেন। এবি জুবায়েরকেও রক্ষার চেষ্টা করেন ছাত্রদলের কিছু নেতা।
ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা দাবি করেন, জুনিয়র কর্মীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রদল নেতা সাইফ খান বলেন, “আমরা তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। তবে তারা থানায় আসার আগে যে ধরনের পোস্ট দিয়েছে, তাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
অন্যদিকে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, ভুয়া পোস্টটি অন্য একটি আইডি থেকে দেওয়া হলেও মাহমুদের ওপর দায় চাপানো হয়। পরে তিনি থানায় গেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে হামলা চালায়।
ঘটনার পর ছাত্রশিবিরের নেতা ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম থানায় গেলে তাকেও কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে ছাত্রদলের সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন এবং প্রায় ৫০ জন হামলায় অংশ নিয়েছে।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে এবং তাকে শোকজ করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া শাহবাগে হামলার ঘটনায় পৃথক ছয় সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে, যাদের তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।