ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ সাময়িকভাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু–এর জনসমর্থন বাড়ালেও দেশটির রাজনৈতিক সমীকরণে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এখনই নির্বাচন হলে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা তার জন্য কঠিন হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশ্লেষকরা বলেন, প্রায় ১৮ বছর ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা ৭ অক্টোবর হামাস হামলা–এর পর তলানিতে নেমে যায়। পাশাপাশি ঘুষ ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে চলমান বিচার প্রক্রিয়াও তাকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রেখেছে।
তবে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যদি ইরানে সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান ঘটে এবং সরকার পতন হয়, তাহলে পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর অনুকূলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
৫ মার্চ প্রকাশিত ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট–এর এক জরিপে দেখা যায়, ৮২ শতাংশ ইসরায়েলি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।
বিশ্লেষক তাল স্নাইডার বলেন, অধিকাংশ ইসরায়েলি ৭ অক্টোবরের বিপর্যয়ের জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করলেও ইয়াহিয়া সিনওয়ার, ইসমাইল হানিয়া এবং হাসান নাসরুল্লাহ–এর মতো নেতাদের হত্যার কৃতিত্ব অনেকেই তাকে দিচ্ছেন।
তার মতে, ইসরায়েলের জনমত এখনও মূলত দুই রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত—ক্ষমতাসীন কট্টর ডানপন্থি জোট এবং বিস্তৃত বিরোধী শিবির। কোনো পক্ষই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অবস্থানে নেই।
চ্যানেল ১৩–এর ১০ মার্চের এক জরিপ অনুযায়ী, ২৫টি আসন নিয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে টিকে থাকতে পারে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। আর নাফতালি বেনেট–এর দল পেতে পারে ১৭টি আসন। সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোটের সম্ভাব্য আসন সংখ্যা হতে পারে ৫১টি, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে ১০টি কম।
গিডিয়ন রাহাত মনে করেন, যুদ্ধের মাধ্যমে নিজের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের আশা করেছিলেন নেতানিয়াহু। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, ইরান সরকারের পতন সহজ হবে না বলেই মনে হচ্ছে। ফলে তিনি হয়তো সেই প্রত্যাশিত ‘বিজয়ের ছবি’ পাবেন না।
তার মতে, যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই প্রত্যাশার মাত্রা খুব বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তুলনামূলক সীমিত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলে বিজয় ঘোষণা করা তাদের জন্য সহজ হতো।
রাহাত আরও বলেন, ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার পরও নেতানিয়াহু যেভাবে ক্ষমতায় টিকে আছেন, তাতে তিনি আবারও ২০২২ সালের মতো একাধিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিরোধী জোটকে দুর্বল করার কৌশল নিতে পারেন।
ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে হওয়ার কথা। তবে বিরোধী নেতাদের ধারণা, যুদ্ধের সম্ভাব্য সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু ৭ অক্টোবরের বার্ষিকীর আগেই আগাম নির্বাচন দিতে পারেন।
বিরোধী শিবিরের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নেতানিয়াহু চান না নির্বাচনী প্রচারণা ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা বা তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিকে কেন্দ্র করে হোক। তিনি বরং ইরান যুদ্ধকে প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন।
এদিকে যুদ্ধের চেয়েও ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় বিতর্ক হয়ে উঠেছে আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি।
৭ অক্টোবরের পর লাখ লাখ রিজার্ভ সেনাকে গাজা ও লেবাননে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আরও প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার রিজার্ভ সেনাকে তলব করা হয়েছে।
দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে যে, অনেক অতি-গোঁড়া ইহুদি তরুণ ধর্মীয় শিক্ষার অজুহাতে সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন না।
বিশ্লেষক তাল স্নাইডার বলেন, নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের মূল শক্তি এখন অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো—বিশেষ করে সামরিক নিয়োগ বিতর্ক, অর্থনৈতিক চাপ, পুলিশি বর্বরতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা।