পুলিশ সংস্কার ও পুনর্গঠনে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনচির সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ সহযোগিতা কামনা করেন।
প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, মানব পাচার প্রতিরোধ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে সহায়তা চাওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে জাপান পুলিশের উল্লেখযোগ্য দক্ষতা রয়েছে। জাপানের পুলিশিং ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম কার্যকর মডেল হিসেবেও বিবেচিত।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পুলিশ সংস্কারে জাপান প্রধানত পাঁচ ধরনের সহায়তা দিতে পারে। সেগুলো হলো—প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, কমিউনিটি পুলিশিং পদ্ধতি, প্রশাসনিক ও কাঠামোগত সংস্কার, প্রযুক্তি ও আধুনিক সরঞ্জাম এবং অবকাঠামো উন্নয়ন।
জাপান ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে পুলিশিং ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও প্রশাসনিক সক্ষমতা উন্নয়নে কাজ করেছে। সে ক্ষেত্রে পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং আধুনিক পুলিশ নীতিমালা প্রণয়নে বাংলাদেশ জাপানের সহায়তা নিতে পারে। এছাড়া প্রযুক্তি ও আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহেও জাপান বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগিতা কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা দিয়ে থাকে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি, স্মার্ট নজরদারি ক্যামেরা, তথ্যব্যবস্থা এবং ডিজিটাল অপরাধ বিশ্লেষণ ব্যবস্থার উন্নয়নেও দেশটি সহায়তা করতে পারে।
জাপান কিছু দেশে পুলিশ একাডেমি, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং থানার অবকাঠামো নির্মাণেও সহায়তা করেছে। বাংলাদেশেও আধুনিক পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং বিশেষায়িত তদন্ত গবেষণাগার স্থাপনে জাপানের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।
৩ মার্চের বৈঠকে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনচি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক নিরাপত্তা প্রকল্পটি গত বছর শেষ হয়েছে। আমরা পুলিশ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের সঙ্গে আরও কাজ করতে আগ্রহী।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাপান বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু এবং অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদার। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার মাধ্যমে দেশটি মেট্রোরেল ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে।
তিনি বলেন, জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। এর আগে জাপান ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নেও কাজ করেছে। ভবিষ্যতে পুলিশ সংস্কার ও পুনর্গঠনে জাপান সহযোগিতা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দক্ষ ও সুসংগঠিত পুলিশিং ব্যবস্থার কারণে জাপান বিশ্বের নিরাপদ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশটিতে অপরাধের হার তুলনামূলক কম এবং পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা অনেক বেশি। জাতীয় পুলিশ সংস্থার মাধ্যমে জাপানে পুলিশের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
জাপানের পুলিশিং ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট পুলিশ বুথ বা ‘কোবান’ ব্যবস্থা। এসব বুথ থেকে পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। পথনির্দেশ দেওয়া, হারানো জিনিস উদ্ধার করা কিংবা ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে সাধারণ মানুষকে সহযোগিতা করেন তারা। এতে পুলিশ ও নাগরিকদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয় এবং অপরাধ প্রতিরোধ সহজ হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশেও এ ধরনের কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে। পাশাপাশি স্বচ্ছ তদন্ত ব্যবস্থা, স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত প্রক্রিয়া, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা এবং মানবাধিকারভিত্তিক আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং ও বিশেষায়িত তদন্ত দক্ষতা বাড়ানো গেলে দ্রুত অপরাধ শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
তবে এ ক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ জাপানের নাগরিকরা আইন মেনে চলার সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী এবং সামাজিকভাবে অনেক বেশি সচেতন, যা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা ফয়সল হাসান জানান, পুলিশের পুনর্গঠন ও সংস্কারে সহায়তা বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে জাপানের রাষ্ট্রদূতের আন্তরিক আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কিছু প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কবে নাগাদ তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না।