ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে রাজশাহীর পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে, শত শত পরিবার পানিবন্দি। চাঁপাইনবাবগঞ্জেও একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মানুষের ভোগান্তি বেড়ে চলেছে, গবাদিপশু ও কৃষিজমি রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছেন স্থানীয়রা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) রাজশাহী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় পদ্মার পানির উচ্চতা ১৭ দশমিক ৪৯ মিটার রেকর্ড করা হয়, যা বিপদসীমা (১৮ দশমিক ০৫ মিটার) থেকে ৫৬ সেন্টিমিটার নিচে। গত চার দিনে ধারাবাহিকভাবে পানি বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে—
পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানান, “ফারাক্কার সব কপাট খুলে দেওয়ার পাশাপাশি ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই ভারী বর্ষণ হয়েছে, ফলে পদ্মায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত দুই-তিন বছরের মধ্যে এবার পানির উচ্চতা ও প্রবাহ অনেক বেশি।”
রাজশাহী শহরের তালাইমারী, কাজলা, পঞ্চবটি, পাঠানপাড়া লালনশাহ মঞ্চ, শ্রীরামপুরসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত। শহরের দক্ষিণের চরখিদিরপুর, খানপুর ও বাঘার চক রাজাপুরের বেশিরভাগ অংশও পানির নিচে। শুধু শ্রীরামপুরেই অন্তত ৩০টি পরিবার নতুন করে পানিবন্দি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহাবুল নৌকায় করে ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, “আজ থেকে আর থাকা যাচ্ছে না। সব ডুবে গেছে।”
গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন অনেকে। শহর রক্ষা বাঁধের নিচে ১৮টি গরু বেঁধে রেখেছেন তাহাসীন আলী। তার বাড়িতে বুকসমান পানি উঠেছে।
শহর রক্ষা বাঁধের টি-বাঁধ ও আই-বাঁধ এলাকায় পানির চাপ সামাল দিতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মার চরে অবস্থিত চকরাজাপুর হাইস্কুল নদী ভাঙনের মুখে। স্কুল ভবন থেকে ভাঙন মাত্র ৫ মিটার দূরে। ইতিমধ্যে স্কুল মাঠ ও চারটি টিনের ঘর পদ্মায় বিলীন হয়েছে। সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, “যেকোনও সময় পাকা ভবন নদীতে চলে যাবে।”
নিচু ক্লাসরুমে পানি ঢুকে পড়েছে, ফলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে গেছে। অনেকে পানি মাড়িয়ে আসলেও ভিজে যাওয়ায় ক্লাসে বসতে পারছে না।
পবা উপজেলার দুর্গম চরখিদিরপুর, চরখানপুর ও চরতারানগরে নৌকায় করে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস। প্রায় ২০০টি পরিবারের মাঝে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে।
পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত আমান আজিজ বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্যও পরিকল্পনা রয়েছে।”
পদ্মার পানিতে চরাঞ্চলের বসতভিটা ও শত শত বিঘা কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। আম, কুল, পেয়ারা ও সবজি ক্ষেত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন জানান, পাকশী ও লক্ষ্মীকুন্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমিতে পানি ঢুকেছে, যা কৃষকদের বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জেও পদ্মার পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পানি ঢুকেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানিয়েছেন, “পানি দুই দিন পর থেকে কমতে পারে। আপাতত এটাকে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতি বলা যায়।”
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে বুধবার পানির উচ্চতা ছিল ১২ দশমিক ৯০ সেন্টিমিটার, বিপদসীমা ১৩ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার। প্রতিদিন গড়ে ১০–১২ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।