মধ্যপ্রাচ্যে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ জন মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দি ইন্টারসেপ্ট। তবে এই বাস্তবতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করছে না পেন্টাগন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক কার্যক্রম তদারককারী মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) হতাহতের তথ্য গোপন করছে। এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, সংস্থাটি কম ও পুরোনো তথ্য সরবরাহ করছে এবং হতাহতদের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যাও দিচ্ছে না।
গত ২৪ মার্চ হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
গত ২৭ মার্চ সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় অন্তত ১৫ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন বলে দুই সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এক মাসের কিছু বেশি সময় আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে শত শত মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছেন।
যুদ্ধে নিহত প্রথম মার্কিন সেনাদের মরদেহ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, এমন সংঘাতে হতাহতের ঘটনা অনিবার্য। তিনি বলেন, “এই ধরনের সংঘাতে মৃত্যু হবেই… কাজটা শেষ করতে হবে।”
এদিকে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, দুই সপ্তাহের মধ্যেই তিনি ইরান যুদ্ধ গুটিয়ে নিতে পারেন। যদিও ঘোষিত বেশ কিছু লক্ষ্য—যেমন ইরানের জনগণের ‘স্বাধীনতা’, তেল নিয়ন্ত্রণ এবং নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ—এখনো অর্জিত হয়নি।
সেন্টকমের দেওয়া হতাহতের তথ্যকে অসম্পূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে দি ইন্টারসেপ্ট। সংস্থাটির মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানান, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর প্রায় ৩০৩ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। তবে এই তথ্য পুরোনো এবং সাম্প্রতিক হামলার হতাহতের হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
এছাড়া কতজন সেনা নিহত হয়েছেন, সেই তথ্য প্রকাশ করতেও অনাগ্রহ দেখিয়েছে সেন্টকম। দি ইন্টারসেপ্টের বিশ্লেষণে অন্তত ১৫ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, “স্পষ্টতই এই বিষয়টি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ ও হোয়াইট হাউস আড়াল করতে চাইছে।”
২০২৪ সালে জো বাইডেন প্রশাসনের সময় পেন্টাগন হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করলেও বর্তমান প্রশাসনে সে স্বচ্ছতা নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বর্তমান হিসাবের বাইরে রয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড’-এ অগ্নিকাণ্ডে আহত দুই শতাধিক নৌসেনার তথ্যও।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’-এর বিশ্লেষক জেনিফার কাভানাঘ বলেন, “যুদ্ধের খরচ ও ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য দেওয়া উচিত, কারণ এর ব্যয় বহন করছে মার্কিন জনগণ।”
মার্কিন হামলার জবাবে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তবে কতটি ঘাঁটি আক্রান্ত হয়েছে, সে তথ্যও প্রকাশ করেনি সেন্টকম।
দি ইন্টারসেপ্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ দাবি করেন, ইরানের হামলা কার্যকর হবে না এবং অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা সম্ভব। তবে বাস্তবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতার ইরানি হামলার ঘটনা নিশ্চিত করেছে।
ইরানের হামলার কারণে কিছু মার্কিন সেনাকে ঘাঁটি ছেড়ে হোটেল ও অফিস ভবনে আশ্রয় নিতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে বলে মত দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জোসেফ ভোটেল।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এতে বেসামরিক স্থাপনাও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে এবং কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক অবকাঠামোকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান যুদ্ধ ও পূর্ববর্তী হামলাগুলো মিলিয়ে মার্কিন সেনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোট হতাহতের সংখ্যা ১৩ হাজার ৬০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।