শিরোনাম :
পারমাণবিক আগুনে ঘি ঢালছে মধ্যপ্রাচ্য হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচলে শক্ত বার্তা চীনের কবির আহমেদ ভূইয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া ও এতিমখানায় খাবার বিতরণ সরকার জনগণের সঙ্গে ‘মিথ্যাচার’ করছে: রুমিন ফারহানা ‘জলদস্যুতার’ অভিযোগে আবারও বন্ধ হরমুজ প্রণালী একটি সমাধি ঘিরে অসংখ্য বিশ্বাসের গল্প সু চির সাজা কমালেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং হরমুজ প্রণালি সচল করতে প্যারিসে বিশ্ব সম্মেলন: ম্যাক্রোঁ-স্টারমারের বড় কূটনৈতিক উদ্যোগ হজযাত্রীদের পদচারণায় মুখর আশকোনা হজক্যাম্প: রাতে উড়ছে প্রথম ফ্লাইট সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার শুরু ইরানের সঙ্গে চুক্তি হলে পাকিস্তান সফরে যেতে পারেন ট্রাম্প

হারানোর ভয় না থাকা ইরানের কী করার আছে?

২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ রিপোর্ট
  • সর্বশেষ আপডেট : সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করে ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতে তেহরান শুধু ইসরায়েলের শহরগুলোতেই নয়, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পাল্টা হামলার সক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেই সক্ষমতা কমলেও প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

ইরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো—লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া কিংবা ইয়েমেনের হুথিরা—যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা অন্য কোথাও হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তা বাহিনীও সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে।

গত সপ্তাহে ‘টাইম’ সাময়িকী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেছিল, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে হামলার আশঙ্কা রয়েছে কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, এমন আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তিনি বলেন, “আমার মনে হয় হুমকি আছে। আমেরিকানদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণও আছে। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে কিছু ঘটনা ঘটতেই পারে। যখন আপনি যুদ্ধে যান, কিছু মানুষ তো মারা যাবেই।”

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সওফান সেন্টার’-এর নির্বাহী পরিচালক কোলিন পি ক্লার্ক মনে করেন, ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্য শুধু প্রতিশোধ নয়। পশ্চিমা দেশগুলোর ভেতরে জনমতেও প্রভাব ফেলতে চায় তেহরান।

তার মতে, হামলার মাধ্যমে যদি পশ্চিমা দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বাড়ানো যায়, তাহলে তাদের সরকারগুলো ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।

ক্লার্ক বলেন, ইরানের খুব বেশি কিছু হারানোর নেই। ফলে তারা আগের তুলনায় আরও আক্রমণাত্মক কৌশল নিতে পারে। এর অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিজেদের ভূখণ্ডেও সম্ভাব্য সহিংসতার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রচলিত অর্থে যুদ্ধ জয়ের জন্য ইরান লড়ছে না। বরং তাদের লক্ষ্য হলো যেকোনোভাবে টিকে থাকা।

সংবাদমাধ্যমটির মতে, ইরান দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রতিরোধ’ ও ‘সহনশীলতার’ ওপর ভিত্তি করে নিজেদের সামরিক কৌশল গড়ে তুলেছে। গত এক দশকে তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দূরপাল্লার ড্রোন এবং অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পেছনে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।

দ্য আটলান্টিকে প্রকাশিত এক নিবন্ধে কোলিন পি ক্লার্ক লিখেছেন, বিদেশে প্রতিশোধমূলক হামলার ইতিহাসও ইরান ও তাদের মিত্রদের দীর্ঘদিনের।

১৯৯২ সালে লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা আব্বাস মুসাউইকে হত্যা করে ইসরায়েল। এর জবাবে আর্জেন্টিনায় ইসরায়েলি দূতাবাসে গাড়িবোমা হামলা চালিয়ে ২৯ জনকে হত্যা করা হয়। দুই বছর পর একই শহরের একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে হামলা চালিয়ে নিহত হয় ৮৫ জন।

লাতিন আমেরিকাজুড়ে হিজবুল্লাহ বহু বছর ধরে তাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে এবং সেখানে হামলার সক্ষমতা এখনো রয়েছে বলে মনে করা হয়।

২০১২ সালে বুলগেরিয়ার বুরগাস শহরে ইসরায়েলি পর্যটকবাহী একটি বাসে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ছয়জন নিহত হয়। সেই হামলার জন্যও হিজবুল্লাহকে দায়ী করা হয়েছিল।

ক্লার্ক বলেন, গত কয়েক দশকে বলিভিয়া, সাইপ্রাস, জর্জিয়া, কেনিয়া, পেরু, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট বহু হামলার পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়া হয়েছে।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করে। এরপর থেকে ইরান প্রতিশোধমূলক বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্লার্কের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ইরান-সংশ্লিষ্ট অন্তত ১৭টি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা হয়েছে। মার্কিন রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার পরিকল্পনার অভিযোগও উঠেছে তেহরানের বিরুদ্ধে।

যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানও দাবি করেছেন, গত তিন বছরে সেখানে ইরান-সমর্থিত অন্তত ২০টি ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা হয়েছে।

বিবিসি বলছে, ইরান এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড তাদের নাগালের বাইরে হলেও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মার্কিন ঘাঁটি তাদের আঘাতের পরিসরে রয়েছে। একইভাবে ইসরায়েলও তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যে।

চলমান যুদ্ধে ইরান দেখিয়েছে, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করা তাদের পক্ষে পুরোপুরি অসম্ভব নয়। কোনো একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে পারলেই তা শুধু সামরিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকভাবেও প্রভাব ফেলে।

এ সংঘাতে জ্বালানিও বড় একটি কৌশলগত অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি এখনো ইরান পুরোপুরি বন্ধ করেনি। কিন্তু উত্তেজনা বাড়তেই বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চাপ যদি আরও বাড়ে, তাহলে যুদ্ধ বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপও বাড়তে পারে।

প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে তেহরান হয়তো এই বার্তাই দিতে চাইছে—মার্কিন বাহিনীকে আশ্রয় দেওয়া মানেই নিরাপত্তা ঝুঁকি নেওয়া।

ইরানের আশা, এসব দেশের সরকার যুদ্ধ সীমিত বা বন্ধ করার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি তেহরানের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলও হতে পারে। কারণ এতে ওই দেশগুলো আরও শক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াতে পারে।

বিবিসির সাংবাদিক আমির আজিমি লিখেছেন, ইরানের মূল লক্ষ্য যদি টিকে থাকা হয়, তাহলে শত্রুর সংখ্যা বাড়ানো তাদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। আবার অতিরিক্ত সংযম দেখালেও সেটি দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হতে পারে।

তার মতে, তেহরানের কৌশল সম্ভবত এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—তারা যতটা ক্ষতি সহ্য করতে পারবে, প্রতিপক্ষ হয়তো সেই মাত্রার ক্ষতি সহ্য করার খরচ বহন করতে চাইবে না।

অর্থাৎ, এই যুদ্ধে ইরানের লক্ষ্য জয় নয়; লক্ষ্য টিকে থাকা। তবে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে কি না এবং তা প্রতিবেশীদের দূরে ঠেলে না দিয়েই করা যাবে কি না—তার উত্তর এখনো অনিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

 

আরও
© All rights reserved © 2026 24ghantabangladesh
Developer Design Host BD