পপ সংগীতভিত্তিক জীবনীচিত্রে দর্শকের প্রত্যাশা সাধারণত স্পষ্ট—প্রিয় তারকার গৌরব, সংগ্রাম ও ব্যক্তিজীবনের অজানা দিকগুলোকে নতুনভাবে দেখা। কিন্তু জ্যাকসন এর ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই বৈশ্বিক সুপারস্টার হয়ে ওঠা এই শিল্পীর জীবন এতটাই আলোচিত যে, সেটি অনেকটাই যেন এক চলমান “লাইভ বায়োপিক”।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ফাকুয়া নির্মিত বড় বাজেটের চলচ্চিত্রটি এমন এক গল্প বলার চেষ্টা করে, যার অনেকটাই দর্শকের আগে থেকেই জানা। তবে সমালোচকদের মতে, ছবিটি সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেছে মাইকেলের জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়—বিশেষ করে শিশু নির্যাতনের অভিযোগগুলো। ফলে এটি হয়ে উঠেছে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত এবং কিছুটা একপেশে জীবনীচিত্র।
তবুও আশ্চর্যজনকভাবে ছবিটি একঘেয়ে হয়ে পড়ে না। বরং মাঝারি মানের নির্মাণ হলেও এটি দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখতে সক্ষম। অনেকটা পুরোনো ধাঁচের টেলিভিশন জীবনীচিত্রের স্বাদ থাকলেও উন্নত প্রযোজনা ও অভিনয় ছবিটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
চলচ্চিত্রে মাইকেলের ক্যারিয়ারের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো তুলে ধরা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনায়—জনপ্রিয় গান, ঐতিহাসিক পরিবেশনা এবং মঞ্চের জাদুকরী উপস্থিতি ছবির মূল আকর্ষণ। তবে তার ব্যক্তিগত জটিলতা ও মানসিক দ্বন্দ্বকে গভীরভাবে অনুসন্ধান না করে গল্পটিকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে পারিবারিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষত কঠোর ও নিয়ন্ত্রণপ্রবণ পিতার চরিত্রে।
ছবির বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে সংগীত, নাচ এবং পরিবেশনা—যা নিঃসন্দেহে দর্শকের জন্য সবচেয়ে উপভোগ্য অংশ। বিশেষ করে মঞ্চে মাইকেলের উপস্থিতি দৃশ্যগুলো ছবির গতি ধরে রাখে। তবে গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এক শিল্পীর আত্মগঠনের যাত্রা—শৈশবের কঠোরতা পেরিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করার সংগ্রাম। যদিও এই যাত্রা অনেকটাই সংক্ষিপ্তভাবে দেখানো হয়েছে, তবুও তা দর্শকের মনে প্রভাব ফেলে।
চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক নিঃসন্দেহে প্রধান অভিনেতার অভিনয়। মাইকেল জ্যাকসনের ভাগ্নে জাফর জ্যাকসন প্রথমবারের মতো বড় পর্দায় অভিনয় করেই চমক দেখিয়েছেন। হাঁটা, কথা বলা, নাচ এবং মঞ্চে বিদ্যুৎময় উপস্থিতি—সব মিলিয়ে তিনি চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছেন। তার অভিনয়ে মাইকেল শুধু একজন সুপারস্টার নন; বরং একসঙ্গে সংবেদনশীল, ভঙ্গুর এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্ব হিসেবেও ধরা পড়ে।
গল্পের শুরুতে দেখা যায় কঠোর পারিবারিক পরিবেশ, যেখানে এক পিতা তার সন্তানদের দিয়ে নিরলস অনুশীলন করান, পরিবারের ভাগ্য বদলের আশায়। কিন্তু সেই কঠোরতা অনেক সময় চাপ ও মানসিক নির্যাতনের রূপ নেয়। এই প্রেক্ষাপট থেকেই উঠে আসে এক ভিন্নধর্মী শিশু—সংবেদনশীল, একাকী এবং ধীরে ধীরে খ্যাতির ভেতর নিজেকে হারাতে থাকা মাইকেল।
পরবর্তীতে নিজের সংগীত জীবনের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়া, প্রযোজকদের সঙ্গে কাজ করা এবং বিশ্বজুড়ে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছানো—সবকিছুই ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। তবে অতীতের ছায়া তাকে পুরোপুরি ছেড়ে যায় না—এই ইঙ্গিতও চলচ্চিত্রে রয়েছে।
শেষদিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশনার মাধ্যমে ছবিটি এমন ইঙ্গিত দেয় যে, মাইকেলের গল্প এখানেই শেষ নয়—বরং এটি আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
সব মিলিয়ে, এটি হয়তো পূর্ণাঙ্গ বা গভীর জীবনীচিত্র নয়, বরং একটি নিরাপদ নির্মাণ। তবুও জ্যাকসন -এর মঞ্চসুলভ ক্যারিশমা এবং উপস্থিতির শক্তি পুরো চলচ্চিত্রজুড়ে দর্শককে ধরে রাখে।