চলতি অর্থবছরের আট মাস পার হলেও দেশের রফতানি আয়ে স্বস্তি ফেরেনি। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা সাত মাস নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকেও মন্দার ছাপ স্পষ্ট। এর মধ্যেই ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাত নতুন করে উত্তপ্ত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের রফতানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-র সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ২৮১ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। যা জানুয়ারির তুলনায় ২২ দশমিক ১০ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এ খাতে আয় কমেছে ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৯০ কোটি ৫৮ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই আয় হয়েছে ৩৪৯ কোটি ৫৩ লাখ ডলার—জানুয়ারির তুলনায় ২০ দশমিক ৮১ শতাংশ কম।
উদ্যোক্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে চাহিদা কমার চাপের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
সংঘাত চতুর্থ দিনে গড়াতেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। সরবরাহ ঝুঁকি ও নিরাপত্তা শঙ্কায় অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন খরচ বাড়বে, বাড়বে মূল্যস্ফীতির চাপও।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পোশাক শিল্পের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি দাম আদায় করা কঠিন হবে, কারণ প্রধান বাজারগুলোতেই ভোক্তা চাহিদা কমছে।
সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত এ নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। সামান্য অস্থিরতার ইঙ্গিতেই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। বিকল্প রুট ব্যবহারে ফ্রেইট চার্জ ও বিমা প্রিমিয়াম বাড়বে, যা রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের আমদানিকৃত এলএনজির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার প্রায় সব চালানই হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আসে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩৬ লাখ টন এলএনজি আমদানি করেছে, যার অর্ধেকের বেশি ওই অঞ্চল থেকে। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে পারে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে আরব দেশগুলোতে বাংলাদেশের রফতানি ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির প্রায় ২ শতাংশ। এর ৬০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক। আকাশপথে বিঘ্ন ঘটলে পচনশীল পণ্য ক্ষতির মুখে পড়বে, আর নির্ধারিত সময়ের ডেলিভারি ব্যাহত হবে।
উপসাগরীয় আকাশসীমার অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে—এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার অন্যতম ট্রানজিট হাব। ফ্লাইট পুনর্নির্ধারণ ও স্থগিতের ফলে কার্গো চলাচলেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ বিঘ্ন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রধান বাজারে চাহিদা সংকোচন—সব মিলিয়ে রফতানিনির্ভর অর্থনীতির সামনে বহুমাত্রিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, আপাতত আতঙ্কের কারণ না থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জ্বালানির দাম ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়বে, যা বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় ও রফতানি আদেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার যদি জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বিশেষ ঋণসুবিধা অব্যাহত রাখা এবং রফতানিকারকদের নীতিগত সহায়তা জোরদার করে, তাহলে সাময়িক ধাক্কা সামলে ওঠা সম্ভব।