আন্তর্জাতিক নির্যাতনবিরোধী দিবস আজ

আন্তর্জাতিক নির্যাতনবিরোধী দিবস
মুহাম্মদ নূরে আলম

বিশ্ব যতই আধুনিক হোক, মানবতার অপমান যেন কিছুতেই থামে না। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখনো মানুষ নিপীড়ন, অবমাননা ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। কোথাও মতের পার্থক্য, কোথাও পরিচয়ের বিভাজন, আবার কোথাও শুধুই ভিন্ন সংস্কৃতি—এসব কারণেই মানুষ আজো সম্মানহানির মুখোমুখি। অথচ মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্ট: কোনো অবস্থাতেই শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন গ্রহণযোগ্য নয়।

আজ ২৬ জুন, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস। এই দিনে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে একটি জরুরি প্রশ্ন—আমরা কি যথেষ্ট মানবিক হতে পেরেছি?

নির্যাতন বলতে আমরা শুধু হাত-পা বাঁধা, অন্ধকার কক্ষে মারধরের দৃশ্য কল্পনা করি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, কারো সম্মান ভাঙা, জোর করে তথ্য আদায়, ভয় দেখানো বা মানসিক চাপে রাখা—সবই নির্যাতনের পরিধির মধ্যে পড়ে। শাস্তি দেওয়ার অজুহাতে কিংবা পরিস্থিতির অস্থিরতাকে পুঁজি করে অনেক সময়ই মানুষ এমন কষ্টের মধ্য দিয়ে যান, যার দাগ থেকে যায় সারা জীবন।

জাতিসংঘ ১৯৮৪ সালে ‘কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার’ নামের একটি চুক্তি গ্রহণ করে, যা ১৯৮৭ সালে কার্যকর হয়। আজ পর্যন্ত ১৭৪টি দেশ এই চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্যাতনকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি যুদ্ধ, জরুরি অবস্থা বা রাজনৈতিক গোলযোগের সময়েও কাউকে নির্যাতন করা যাবে না বলে বলা হয়েছে এতে। প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যথাযথ আইন প্রণয়ন ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।

এই ভয়াবহতার মুখে পড়ে কেবল কয়েদি বা বিরোধী দলীয় নেতা নন। শিশুদের শাসনের নামে মারধর, নারীদের ওপর সামাজিক বা মানসিক চাপ, শিক্ষার্থী বা সাংবাদিকদের মত প্রকাশে বাধা—সবই নির্যাতনের সমান্তরাল বাস্তবতা। যারা সংবেদনশীল পেশায় কাজ করেন, যেমন শিক্ষকতা, চিকিৎসা কিংবা সাংবাদিকতা—তাদের অনেকেই অহরহ সম্মানহানিকর অবস্থায় পড়েন, কখনো কোনো প্রতিরোধের সুযোগ ছাড়াই।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই অভিজ্ঞতা অনেক সময় শরীরের চেয়েও বেশি ক্ষতি করে মানুষের মনোজগতে। তাই জাতিসংঘ ১৯৮১ সালে গঠন করে ‘ভলান্টারি ফান্ড ফর ভিকটিমস অব টর্চার’। এই তহবিল থেকে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের চিকিৎসা, আইনগত সহায়তা ও মানসিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।

জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস জানিয়েছেন, “আমি বহু মানুষের মুখ মনে রেখেছি, যারা নির্যাতনের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের গল্প আমাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।”

নির্যাতন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক চুক্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সমাজে মানবিকতা ও সহনশীলতার চর্চা। শিশুদের প্রতি মমতা, নারীর প্রতি সম্মান, মতভেদকে গ্রহণ করার মানসিকতা যদি পরিবারে-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না গড়ে ওঠে, তবে কোনো আইনই কার্যকর হতে পারে না।

আজকের এই আন্তর্জাতিক দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক তারিখ নয়—এটি আমাদের বিবেকের আয়নায় মুখ দেখার দিন। প্রশ্ন জাগে—আমরা কি অন্যের যন্ত্রণাকে অনুভব করি? আমরা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলি?

যদি উত্তর হয় ‘হ্যাঁ’, তবে সভ্যতা এগোচ্ছে। আর যদি ‘না’ হয়, তবে যতই উন্নয়নের বুলি কপচাই, আসলে তা টিকবে না। কারণ নির্যাতনের ক্ষত শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজকে বিষিয়ে তোলে।

সংবেদনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা—এই তিন অস্ত্র দিয়েই নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সম্ভব। আজকের দিনটি আমাদের সেই প্রতিজ্ঞা করার সুযোগ করে দেয়।

মুহাম্মদ নূরে আলম

মুহাম্মদ নূরে আলম

মুহাম্মদ নূরে আলম (Muhammad Noora Alam) একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও কনটেন্ট বিশেষজ্ঞ, যিনি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রিন্ট, অনলাইন এবং ডিজিটাল মিডিয়ায় কাজ করে যাচ্ছেন।

Leave a Reply

scroll to top