কোরবানির হাটে প্রস্তুতির শেষ মুহূর্ত

দাম চড়ছে গরুর, টানাপোড়েনে ক্রেতা-বিক্রেতা

গরুর দাম আকাশছোঁয়া, বিক্রেতা-ক্রেতার মধ্যে সমঝোতা, ডিজিটাল হাটে বিশ্বাসঘাটির অভিযোগ—ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের কোরবানির পশুর বাজারে চলছে নানা অস্থিরতা ও প্রস্তুতি।
মুহাম্মদ নূরে আলম

ঢাকা ও বিভিন্ন জেলা থেকে: রাজধানীর গাবতলী হাটে ঢুকে প্রথম যে কথাটি শুনতে হয়— “ভাই, গরু লইয়া যান, এখনি লইয়া যান, আগায় গেলে আর পাইবেন না!” গরুর দাম আকাশছোঁয়া, বিক্রেতা-ক্রেতার মধ্যে সমঝোতা, ডিজিটাল হাটে বিশ্বাসঘাটির অভিযোগ—ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের কোরবানির পশুর বাজারে চলছে নানা অস্থিরতা ও প্রস্তুতি।

হাটজুড়ে দামি-দামী গরুর ছড়াছড়ি। কিন্তু কেনাবেচার গতি ধীর। কারণ একটাই—দাম যেন নাগালের বাইরেই।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন গাবতলী হাটসহ রাজধানীর প্রধান হাটগুলোতে ইতিমধ্যে অস্থায়ী কাঠামো, মাইকিং, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার কাজ চলছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখনও অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগ এবং পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত হয়নি।

মো. আজগর আলী, গাবতলী হাটের একজন ব্যবসায়ী বলেন,

“আমরা ৪০টা গরু আনছি মেহেরপুর থেইকা। কিন্তু হাটে জায়গা এখনো ভালোভাবে হয় নাই। ক্রেতাও কম। তার উপর সরকার ভ্যাট (VAT) চাইতেছে ডিজিটাল লেনদেনে, সেও একটা ঝামেলা।”

গরুর দাম কেন এত বেশি?

কথা বলে জানা গেল, কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।

  • খাদ্যের দাম বেড়েছে: গত এক বছরে গোখাদ্য, খৈল ও খড়ের দাম ২০-৩০% বেড়েছে।
  • পরিবহন খরচ: ডিজেলের দাম এবং হাইওয়ের ঘুষ-চাঁদার কারণে পরিবহন খরচও বেড়েছে।
  • সিন্ডিকেট অভিযোগ: অনেকেই বলছেন, মাঝারি ও বড় গরুর বাজারে একটা অদৃশ্য সিন্ডিকেট কাজ করছে।

রাজশাহীর চারঘাটের খামারি আনোয়ার হোসেন বলেন,
“আমার একটা মাঝারি গরু আমি ১ লাখ ২০ চাইতেছি। এইটা আমার খরচের উপরে শুধু ১৫ হাজার লাভ রাখছি। কিন্তু ক্রেতারা বলতেছে দাম বেশি। এখন আমরা কি করুম?”

ক্রেতারা বলছেন ‘দামের কোরবানি’ দিচ্ছেন

ঢাকার মিরপুর থেকে গাবতলী হাটে গরু দেখতে আসা জহিরুল ইসলাম, যিনি ব্যাংকে চাকরি করেন, বলেন—

“গতবার ৯৫ হাজারে গরু নিছিলাম, এবার সেই রকম গরু চাইতেছে এক লাখ ৩০। ইনফ্লেশন বাড়তেছে বুঝি, কিন্তু ইনকাম তো বাড়ে নাই ভাই!”

অনেকেই এখন অনলাইন হাটে চোখ রাখছেন। যদিও অভিযোগ আছে, সেখানে ছবি আর বাস্তব গরুর মিল পাওয়া যায় না।

ডিজিটাল হাট ও অনলাইন বিক্রিতে সুবিধা না বিভ্রান্তি?

সরকারি উদ্যোগে “ডিজিটাল কোরবানি হাট” প্ল্যাটফর্ম চালু হয়েছে কয়েক বছর ধরে। এবারও চালু হয়েছে ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ভিত্তিক এই সেবা। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম “সাধু গরু”, “আমার কোরবানি” এবং “সিটি কোরবানি”–তিনটিই বলছে, তাদের বিক্রি গত বছরের তুলনায় ২৫% কমেছে।

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বললেন,

“বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এখনও প্রশ্ন আছে। অনেকেই ছবি দেখে গরু কিনে পরে ঠকেন। আমরা বিক্রেতাদের যাচাই করার চেষ্টা করছি।”

হাটে স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন?

বিশেষ করে গবাদি পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় এবার কিছু নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঢাকার বড় বড় হাটে পশু চিকিৎসক দল মোতায়েন থাকছে।
পশুসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ডা. সাদিকুল ইসলাম বলেন,

“চর্মরোগ, খুরা রোগসহ অন্যান্য সংক্রমণ ঠেকাতে প্রতিটি গরুকে চেক করা হচ্ছে। গায়ে ইনফেকশন থাকলে হাটে ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না।”

অন্যদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলে হাটে বেচাবিক্রি জমে উঠেছে

রংপুর, গাইবান্ধা, নওগাঁ, নাটোর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ থেকে আসা প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যাচ্ছে—এইসব এলাকায় বড় খামারিরা এবার গরুর উৎপাদন কিছুটা কমিয়ে এনেছেন।
কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে:

  • আগের বছর বিক্রি না হওয়া গরুতে লোকসান।
  • খরচ বেশি হওয়ায় উৎপাদনে অনীহা।

কোরবানির পশু নিয়ে প্রতারণা, গ্রামে গ্রামে ‘ফাঁকি’ গরু

পাবনার সুজানগরের এক ছোট হাটে দেখা গেল, গরু বিক্রেতা ২ বছর বয়সী গরু দেখিয়ে বলছে ৩ বছর।
স্থানীয় এক শিক্ষক মাহফুজ রাহমান বললেন,

“চোয়াল দেখে বুঝতে হয়, গরু আসলে কয় বছরের। কিন্তু এখন বিক্রেতারা সেটা বোঝে না, বোঝে দাম কিভাবে বাড়ানো যায়।”

কোরবানির পশুতে কত টাকাই বা যাচ্ছে?

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক গবেষকদের মতে,

  • প্রতি ঈদুল আজহায় কোরবানির পশু বিক্রি হয় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার উপরে
  • এর মধ্যে ঢাকা শহরের অংশ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা

কিন্তু এর অনেকটাই অপ্রাতিষ্ঠানিক, ফলে রাজস্ব আদায় কম হয়। এবার সরকার চাচ্ছে ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়িয়ে করপূরণ বাড়াতে।

ঈদ যেমন আনন্দের, তেমনি চাপেরও

বিক্রেতা বলছে খরচের চাপ, ক্রেতা বলছে দামের বোঝা—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঈদুল আজহার কোরবানি যেন হয়ে উঠেছে সমঝোতার উৎসব।
তবে একটা কথা সবাই মানছেন—যার যার সাধ্য অনুযায়ী কোরবানি, সেটাই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা।

মুহাম্মদ নূরে আলম

মুহাম্মদ নূরে আলম

মুহাম্মদ নূরে আলম (Muhammad Noora Alam) একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও কনটেন্ট বিশেষজ্ঞ, যিনি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রিন্ট, অনলাইন এবং ডিজিটাল মিডিয়ায় কাজ করে যাচ্ছেন।

Leave a Reply

scroll to top