ডলার দরপতন

ইউরোর বিপরীতে ৩.৫ বছরের সর্বনিম্নে নেমে এলো মার্কিন মুদ্রা

New-Project-2025-06-26T003122.380.jpg
২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ

ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির পর আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে মার্কিন ডলার। বৃহস্পতিবার ইউরোর বিপরীতে ডলারের মান নেমে এসেছে গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। শুধু ইউরো নয়, ব্রিটিশ পাউন্ড, সুইস ফ্রাঁ ও জাপানি ইয়েনসহ প্রায় সব প্রধান মুদ্রার বিপরীতেই দুর্বল হয়েছে ডলার।

বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপমূলক বক্তব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ফেডের স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে ফেডের ওপর আস্থা হারাচ্ছে বাজার, যা ডলারের মূল্যে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

বৃহস্পতিবার ইউরোর মান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.১৬৮৭ ডলারে, যা ২০২১ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ। এটি আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাউন্ডের মান বেড়ে হয়েছে ১.৩৬৯০ ডলার—২০২২ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ডলার–সুইস ফ্রাঁ হার নেমেছে ০.৮৩৩–এ, যা ২০১১ সালের পর সর্বনিম্ন। ইয়েনের বিপরীতেও ডলার দুর্বল হয়ে ১৪৪.৮৯-এ দাঁড়িয়েছে। ডলার সূচক বা DXY–ও নেমে এসেছে ৯৭.৪৯১-এ, যা ২০২২ সালের শুরুর পর সর্বনিম্ন।

বাজারে জোরালো গুঞ্জন ছড়িয়েছে, ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন ট্রাম্প। এই ঘোষণাটি সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যেই আসতে পারে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প যদি এমন ঘোষণা দেন, তবে সেটি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তা ফেডের বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত হানবে। বিনিয়োগকারীদের মতে, এতে ফেডের সুদের হারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইনটাচ ক্যাপিটাল মার্কেটসের এশীয় মুদ্রাবাজার প্রধান কিয়ারান উইলিয়ামস বলেন, ফেডের চেয়ারম্যানকে আগেভাগে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত মনে হলে তা বাজারে নেতিবাচক বার্তা পাঠাবে। এতে বিনিয়োগকারীদের ডলারে আস্থা আরও কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ফেডের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা দেখা দেবে।

বাজারে বর্তমানে ধারণা করা হচ্ছে, জুলাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য ফেড বৈঠকে সুদের হার কমতে পারে। এক সপ্তাহ আগেও যেখানে এই সম্ভাবনা ছিল ১২ শতাংশ, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশে। পুরো বছর শেষে ফেড সুদের হার ৬৪ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমাবে—এমনই পূর্বাভাস দিচ্ছে বাজার। এর আগে ধারণা ছিল ৪৬ বেসিস পয়েন্ট কমবে।

একই সময় ট্রাম্পের শুল্কনীতি ফের আলোচনায় এসেছে। ২ এপ্রিল ঘোষিত নতুন পাল্টা শুল্ক ব্যবস্থা ৯ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সই না হলে নতুন শুল্ক কার্যকর হবে। জেপি মরগান সতর্ক করেছে, ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির হার বাড়তে পারে। এতে মন্দার আশঙ্কা বেড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে তারা মনে করছে।

বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের চোখে ডলারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ডলার এত দিন বিশ্ববাজারে নিরাপদ আশ্রয় ও রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক নানা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জটিলতায় সেই আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন ইউরো ও পাউন্ডের মতো বিকল্প মুদ্রার দিকে ঝুঁকছেন।

বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তা ইউরোপের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এতে ইউরোর প্রতি আস্থা বাড়ছে এবং তা ডলার থেকে মূলধন সরিয়ে ইউরোপমুখী প্রবণতা তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতিতে ডলারের দরপতন কেবল অস্থায়ী নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদেও হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। ডলার যদি রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় স্থিতিশীলতা হারায়, তবে তা বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে শক্তির ভারসাম্যে বড় রদবদল ডেকে আনতে পারে।

Leave a Reply

scroll to top