রাজধানীর অলিগলি পেরিয়ে এখন প্রধান সড়কেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এলাকাভিত্তিক চলাচলের অনুমতি থাকলেও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এসব যান এখন নির্ভয়ে চলছে ব্যস্ততম রাজপথে। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, অন্যদিকে তীব্র হচ্ছে যানজট। প্রশ্ন উঠছে—এই বিশৃঙ্খলার লাগাম কবে টানা হবে?
কেবল ঢাকা নয়, অটোরিকশার এই দৌরাত্ম্য এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি নসিমন, করিমন, ভটভটি ও টমটমের অবাধ চলাচল সড়ক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বুয়েট অনুমোদিত নতুন মডেলের রিকশা নামানো ও চালকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে মাঠপর্যায়ে এর কোনো দৃশ্যমান প্রভাব এখনও নেই।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত মার্চ মাসে দেশে ৫৭৬টি দুর্ঘটনায় ৫৩২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১১৭ জনের মৃত্যুর কারণ ছিল অটোরিকশা ও সমজাতীয় থ্রি-হুইলার। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট দুর্ঘটনার ১৯.৮৪ শতাংশ থ্রি-হুইলার এবং ৬.৪৪ শতাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি যানের কারণে ঘটছে। এছাড়া গত ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১৫ দিনে ২৯৮ জন নিহতের ঘটনায় থ্রি-হুইলারের সংশ্লিষ্টতা ছিল ২২.৩৩ শতাংশ।
সড়কে অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল নিয়ে ক্ষুব্ধ রাজধানীর সাধারণ মানুষ। মোটরসাইকেল চালক কাওসার হোসেন বলেন, “আগের প্যাডেল রিকশার চালকরা গতি নিয়ন্ত্রণ জানতেন। এখনকার চালকদের ব্রেক বা নিয়ম সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। এদের কারণে বাইক চালানোও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।”
নিরাপত্তার পাশাপাশি চার্জ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। মিরপুরের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম জানান, রাস্তার পাশের মেইন লাইন থেকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ নিয়ে এসব রিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে পারে।
সংগ্রাম পরিষদের দাবি: ‘ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ’-এর আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন বলেন, “দ্রুত সরকারি নীতিমালা ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া চালু করা প্রয়োজন। কোনটি প্রধান সড়ক আর কোনটি ফিডার রোড—তা স্পষ্ট নির্ধারণ না থাকায় নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।”
সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এক কর্মকর্তা জানান, বুয়েট অনুমোদিত ই-রিকশা প্রকল্পের কাজ চলছে। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ফ্যাক্টরি ভিজিট শেষ করে রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে এলাকাভিত্তিক রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। ইতোমধ্যেই ২০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ডিএমপির অবস্থান: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, “আমরা প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। তবে পর্যাপ্ত ফিডার রোড না থাকায় শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তবুও নিয়মিত অভিযান ও জরিমানা চলছে। অবৈধ কাউন্টার বন্ধসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তবে সব একদিনে পরিবর্তন সম্ভব নয়।”
রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও আইনি কঠোরতা এখন সময়ের দাবি।





