উপদেষ্টা থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী: ড. খলিলকে ঘিরে প্রশ্ন ও প্রত্যাশা

ও-2.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক বিশেষ প্রতিবেদন

দীর্ঘ দুই দশক পর সরকার গঠন করেও দলের কোনো নেতাকে নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অনেকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও দলীয় ও কূটনৈতিক মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন ড. খলিলুর রহমান। একই দিন বিকেলে টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি নতুন সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলাম।

ড. খলিলুর রহমান এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির এমন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, আগে বিএনপির পক্ষ থেকেই ড. খলিলুর রহমানকে নিয়ে আপত্তি ছিল। এখন তাকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার মতে, বিতর্কিত ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমালোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে কৌশলগত বা আন্তর্জাতিক কোনো সমঝোতা থাকতে পারে বলেও ধারণা প্রকাশ করেন তিনি।

অন্যদিকে, সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে না চাইলেও বলেন, সংশ্লিষ্ট মহলে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে, যা ইঙ্গিত করে সিদ্ধান্তটির ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ ড. খলিলুর রহমানের নিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সিজিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও রোহিঙ্গা ইস্যু এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংবেদনশীল বাণিজ্য আলোচনায় তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো মন্ত্রী নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে আলোচনায় সক্রিয় থাকলে অনেক সময় তাকে সেই দেশের ঘনিষ্ঠ হিসেবে মনে করা হয়। তবে বাস্তবে কৌশলগত যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই সহায়ক হতে পারে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ড. খলিলুর রহমান বলেন, তিনি জোর করে দায়িত্ব নেননি। নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা যাচাই করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কার পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে বিশ্বাস করে। জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রেখেই সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই বিষয়ে সরকারের গুরুত্ব কমবে না বরং আরও জোরদার হবে। আরাকান অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে টেকসই সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

তবে অতীতে তাকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও ছিল। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ এক সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে তার নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। রোহিঙ্গা সংকট ঘিরে মানবিক করিডর প্রসঙ্গেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। যদিও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা যায়।

কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ড. খলিলুর রহমানের যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা তাকে আলোচনায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা, ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক পুনর্গঠন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশগ্রহণ তার কূটনৈতিক দক্ষতার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সমালোচনা থাকলেও তার দীর্ঘ পেশাগত জীবন সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতায় ভরপুর। তিনি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে ১৯৭৯ সালে বিসিএস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে যোগ দেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে আইন, কূটনীতি ও অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

সব মিলিয়ে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নিয়োগ রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি নতুন প্রত্যাশারও জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তার কূটনৈতিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাকে এসব প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

Leave a Reply

scroll to top