বাংলাদেশ–এ জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর নতুন সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এর মধ্যে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি সামনে আনেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। একই ধরনের প্রস্তাব দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর প্রার্থী শিশির মনির।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী জোটের ১১টি দল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয় পেয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–এর নেতৃত্বে সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান। এই প্রেক্ষাপটে বিরোধী দল সংসদের ভেতরে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের চিন্তা করছে বলে জানা গেছে।
ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি এসেছে যুক্তরাজ্য–এর ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে। সেখানে ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থায় বিরোধী দল নিজেদের বিকল্প সরকার হিসেবে প্রস্তুত রাখে। বিরোধীদলীয় নেতা সংসদের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন, যারা সরকারের মন্ত্রীদের কাজ পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাব দেন।
ছায়া মন্ত্রিসভার প্রতিটি সদস্যকে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা খাতের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যেমন শিক্ষা, অর্থনীতি বা স্বরাষ্ট্র—প্রতিটি খাতের জন্য আলাদা ছায়া মন্ত্রী থাকেন। তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করেন এবং সংসদে সরকারকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করান। এতে বিরোধী দল নিজেদের দক্ষতা ও নীতিগত অবস্থানও তুলে ধরতে পারে।
ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যক্রম অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডা–তেও বেশ সক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নির্বাচনে বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে তাদের ছায়া মন্ত্রীরাই পরবর্তীতে প্রকৃত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান।
যুক্তরাজ্যে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিরোধী দলে থাকা লেবার পার্টি–এর নেতা কিয়ার স্টারমার ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। পরবর্তীতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে তাঁর ছায়া মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পান।
ছায়া মন্ত্রীদের কাজ শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়। তারা সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজন—নিয়োগকর্তা, কর্মী, গ্রাহক এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। এর মাধ্যমে খাতভিত্তিক সমস্যাগুলো তুলে ধরে সরকারকে নীতিগতভাবে চ্যালেঞ্জ জানান এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চাপ সৃষ্টি করেন। এতে সংসদীয় বিতর্ক আরও তথ্যভিত্তিক ও গঠনমূলক হয়।
বাংলাদেশে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের নজির নেই। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এটি চালু হলে সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে। অতীতে বিরোধী দলকে অনেক সময় সংসদ বর্জন করতে দেখা গেছে, যার ফলে রাজনৈতিক বিরোধ রাজপথে সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, যিনি সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, মনে করেন ছায়া মন্ত্রিসভা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। তাঁর মতে, বিরোধী দলের সমালোচনা অনেক সময় কাঠামোবদ্ধ নীতিগত আলোচনায় রূপ পায় না। একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকলে বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে গঠনমূলক বিতর্ক সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য সংসদের ভেতরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা গেলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সংঘাত কমবে। ছায়া মন্ত্রিসভা সেই আলোচনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।