মন্ত্রিসভার আকার কেমন হওয়া উচিত?

২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ রিপোর্ট
  • সর্বশেষ আপডেট : রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন। দলীয় প্রধান তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এ অবস্থায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন— নতুন মন্ত্রিসভার আকার কত হওয়া উচিত এবং এতে কারা জায়গা পেতে পারেন।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত, সংসদীয়, তত্ত্বাবধায়ক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মন্ত্রিসভার আকার ভিন্ন ছিল। অতীতে সর্বোচ্চ ৬২ সদস্যের মন্ত্রিসভাও দেখা গেছে। তবে দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় কত সদস্যের মন্ত্রিসভা কার্যকর হবে— এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মাঝারি আকারের মন্ত্রিসভা সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। অনেকে ৪০ সদস্যের মধ্যে মন্ত্রিসভা সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ৫০ সদস্যকে গ্রহণযোগ্য মনে করছেন। অন্যদিকে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৩৫ জনে সীমিত রাখার সুপারিশ করেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ৩০০ আসনের সংসদে সরকার গঠনে ন্যূনতম ১৫১ আসন প্রয়োজন হলেও বিএনপি দুই শতাধিক আসনে জয় লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ হয়েছে এবং নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।

মন্ত্রিসভার আকার প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, খুব ছোট বা অতিরিক্ত বড় মন্ত্রিসভা— কোনোটিই কার্যকর নয়। তার মতে, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী মিলিয়ে ৪০ সদস্যের মধ্যে রাখলে প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে। প্রয়োজনে পরবর্তীতে সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে।

একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা প্রয়োজন। তিনি বলেন, মূল মন্ত্রী সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ জনের মধ্যে রাখলে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়তে পারে এবং প্রয়োজনে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে কাজের ভার বণ্টন করা যেতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি কাঠামোর অনুসারী হওয়ায় সীমিত আকারের মন্ত্রিসভা কার্যকর হতে পারে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় যেমন অর্থ, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যে অত্যন্ত দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া জরুরি। তার মতে, বর্তমান বাস্তবতায় মন্ত্রিসভার আকার ৫০ সদস্যের বেশি হওয়া উচিত নয়। পাশাপাশি তিনি মন্ত্রীদের সুযোগ-সুবিধা সীমিত করে কৃচ্ছ্রসাধনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, ৪০ সদস্যের বেশি হলে মন্ত্রিসভা ‘মাথাভারী’ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তিনি উপমন্ত্রীর পদ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ভারত বা পাকিস্তানের মতো দেশে সাধারণত প্রতিমন্ত্রীর পদই কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, প্রাথমিকভাবে ৩০ থেকে ৪০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করা যুক্তিযুক্ত হবে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানো যেতে পারে। তিনি বিশেষ করে অর্থ, বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দক্ষ নেতৃত্বের ওপর গুরুত্ব দেন।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর কাছে দেওয়া প্রতিবেদনে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর সংখ্যা কমিয়ে ৩৫ জনে সীমিত রাখার সুপারিশ করে। কমিশন একই সঙ্গে বিদ্যমান মন্ত্রণালয় পুনর্বিন্যাস করে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও ৪০টি বিভাগে আনার প্রস্তাব দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অযৌক্তিকভাবে মন্ত্রণালয় বাড়ানোর ফলে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা হ্রাস পেয়েছে।

বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বিভিন্ন সরকারের সময়ে মন্ত্রিসভার আকার উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বশেষ মেয়াদে মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ছিল ৪৪ জন। ২০১৯-২০২৪ মেয়াদে ছিল ৪৯ জন এবং ২০০৯-২০১৪ মেয়াদে সর্বোচ্চ ৬২ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। অন্যদিকে ১৯৯১ সালের সরকারে প্রায় ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা— সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নতুন সরকারকে একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠন করতে হবে। মন্ত্রিসভার আকার শুধু রাজনৈতিক সমন্বয়ের বিষয় নয়; বরং এটি সরকারের কার্যকারিতা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে নতুন সরকার কত সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করে, তা দেশের প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আরও
© All rights reserved © 2026 24ghantabangladesh
Developer Design Host BD