আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইশতেহার পাঠ করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সঞ্চালনা করেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান। বিএনপির ঘোষিত ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’, জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সমন্বয়ে ইশতেহারটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার
ইশতেহারে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচন ও সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সামাজিক বৈষম্য দূর করা এবং জবাবদিহিমূলক জনকল্যাণমূলক সরকার গঠনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সুশাসন ও প্রশাসনিক সংস্কার
দুর্নীতি ও অর্থপাচার দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। উন্মুক্ত দরপত্র, রিয়েল-টাইম অডিট এবং সরকারি প্রকল্পে পারফরম্যান্স অডিট চালুর কথা বলা হয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত ও জনপ্রশাসন দলীয়করণমুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ
গ্রাম ও শহরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় প্রশাসনকে অধিক ক্ষমতা প্রদান এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধানের নীতি অনুসারণ করে শক্তিশালি ও কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যাবস্থা গড়ে তোলা হবে।
সামাজিক সুরক্ষা ও দারিদ্র্য নিরসন
প্রতিটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সামাজিক ভাতা বৃদ্ধি, পেনশন ব্যবস্থা চালু এবং হতদরিদ্র শিশুদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়ন
নারীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সুবিধা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী কল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা
১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, কৃষি বীমা চালু, ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কর্মসংস্থান ও যুব উন্নয়ন
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালু এবং বেকার ভাতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আইটি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, স্টার্টআপ ফান্ড এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, মিড-ডে মিল চালু এবং ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘থ্রি আর’ নীতি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা, নদী খনন এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিট গঠনের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
অর্থনীতি ও বিনিয়োগ
২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাত সংস্কার এবং পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতি
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।
ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজ
‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ নীতির ভিত্তিতে সব ধর্মাবলম্বীর অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ইমাম, পুরোহিতসহ ধর্মীয় নেতাদের সম্মানি প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে।