শিরোনাম :
পারমাণবিক আগুনে ঘি ঢালছে মধ্যপ্রাচ্য হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচলে শক্ত বার্তা চীনের কবির আহমেদ ভূইয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া ও এতিমখানায় খাবার বিতরণ সরকার জনগণের সঙ্গে ‘মিথ্যাচার’ করছে: রুমিন ফারহানা ‘জলদস্যুতার’ অভিযোগে আবারও বন্ধ হরমুজ প্রণালী একটি সমাধি ঘিরে অসংখ্য বিশ্বাসের গল্প সু চির সাজা কমালেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং হরমুজ প্রণালি সচল করতে প্যারিসে বিশ্ব সম্মেলন: ম্যাক্রোঁ-স্টারমারের বড় কূটনৈতিক উদ্যোগ হজযাত্রীদের পদচারণায় মুখর আশকোনা হজক্যাম্প: রাতে উড়ছে প্রথম ফ্লাইট সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার শুরু ইরানের সঙ্গে চুক্তি হলে পাকিস্তান সফরে যেতে পারেন ট্রাম্প

ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশ যাওয়া নারীর স্বপ্নভঙ্গ নির্যাতনে

২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ রিপোর্ট
  • সর্বশেষ আপডেট : রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬

ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশে পাড়ি জমানো বহু বাংলাদেশি নারীর স্বপ্ন ভেঙে গেছে নির্যাতনের শিকার হয়ে। গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরে এসেছেন, যাদের অধিকাংশই শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।

পটুয়াখালীর লিজা আক্তার ছোটবেলায় বাবা–মাকে হারান। পরে স্বামীও তাকে ছেড়ে চলে যান। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে দুই বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু সেখানে চারবার হাতবদল হয়ে অমানবিক যৌন নির্যাতনের শিকার হন।

ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরেন লিজা। এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন তাকে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামে পাঠায়। বর্তমানে নিজের এবং অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।

মৌলভীবাজারের বড়লেখার রিজিয়া বেগমও উন্নত জীবনের আশায় ছয় বছর আগে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যান। সেখানে দীর্ঘ সময় কাজ করানো, পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়া এবং নির্যাতনের শিকার হন তিনি। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় পাঁচ বছর তার কোনো খোঁজ পায়নি পরিবার।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার বিমানবন্দরে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টার ও পিবিআইয়ের সহায়তায় তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। ১৩ দিন পর তিনি পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারেন। বর্তমানে তার চিকিৎসা চলছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। তবে তাদের মধ্যে কতজন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন। তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন। একই সময়ে অন্তত ৮০০ নারীর মরদেহ দেশে এসেছে।

এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি নারী মানব পাচারের শিকার হয়েছেন।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ১৯৯১ সাল থেকে নারী কর্মীরা বিদেশে যাওয়া শুরু করেন। তবে ২০০৪ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এই সংখ্যা বাড়তে থাকে।

২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো বছরে ৫০ হাজারের বেশি নারী বিদেশে যান। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর চুক্তি হওয়ার পর এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ে এবং বছরে এক লাখ ছাড়িয়ে যায়।

২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে করোনা মহামারির সময় বাদ দিলে প্রায় প্রতি বছরই এক লাখের বেশি নারী বিদেশে গেছেন। গত এক দশকে প্রায় পাঁচ লাখ নারী সৌদি আরবে কাজ করতে গেছেন।

বিদেশ থেকে ফিরে আসা নারীদের সুনির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন।

এর মধ্যে করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে এক বছরেই প্রায় ৪৯ হাজার নারী দেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী ডিপোর্টি হিসেবে ২০১৯ সালে দেশে ফেরেন ৩ হাজার ১৪৪ নারী।

করোনার পর ২০২১ সালে ১ হাজার ৮১১ জন, ২০২২ সালে ৬ হাজার ২৯ জন, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৯১৬ জন, ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৩৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে অন্তত ১ হাজার ৮৯১ জন নারী দেশে ফিরেছেন।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকেই ১৫ হাজারের বেশি নারী দেশে ফিরে এসেছেন।

দেশে ফেরা নারী গৃহকর্মীদের অধিকাংশই অভিযোগ করেছেন, তারা বিদেশে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেককে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করানো হয়েছে, নিয়মিত বেতন দেওয়া হয়নি এবং পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হয়নি।

ব্র্যাক জানিয়েছে, ফেরত আসা নারীদের মধ্যে অন্তত ১২১ জন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফিরেছেন এবং তাদের সেবা দেওয়া হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারীর মরদেহ দেশে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরিবারের দাবি, অধিকাংশ ঘটনায় নির্যাতনের বিষয় জড়িত।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশে গিয়ে অনেক নারী কাজের পরিবেশ, খাবার ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা।

তিনি বলেন, বিদেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসা নারীদের অধিকাংশ সময় রাষ্ট্রীয় সহায়তা যথেষ্ট থাকে না। তাদের অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

শরিফুল হাসান আরও বলেন, নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানোর আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, যোগাযোগের সুযোগ এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি দেশে ফিরে আসা নারীদের পুনর্বাসনের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

 

আরও
© All rights reserved © 2026 24ghantabangladesh
Developer Design Host BD