জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের অঙ্গীকার থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। শুরুতে দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলেও এখন প্রক্রিয়াটি থমকে আছে। আইনি জটিলতা, আদালতের মামলা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সংসদ কার্যকর না থাকা, আন্তমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা ও বাজেট সংকটের কারণে বাস্তবায়ন কাজ এগোচ্ছে না। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কিছু সুপারিশে উদ্যোগ নিলেও কাজ চলছে ধীরগতিতে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত ২৫ মে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনা পাঠালেও সেভাবে কাজ এগোয়নি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুরো প্রশাসন মাঠ গোছানোর কাজে ব্যস্ত থাকায় সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়টি এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানিয়েছেন, সরকারের একমাত্র লক্ষ্য ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে আপাতত সংস্কার সুপারিশগুলোতে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংস্কার কমিশনের ২০০-র বেশি সুপারিশের অনেকগুলোই বাস্তবায়নযোগ্য নয়। যেমন পরীক্ষার মাধ্যমে ফিফটি-ফিফটি পদোন্নতি ব্যবস্থা আদালতের রায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আবার দেশকে চারটি প্রদেশে ভাগ করার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করলে স্বাধীনতাবাদী আন্দোলনের ঝুঁকি বাড়তে পারে, বিশেষত পাহাড়ি অঞ্চলে। প্রাদেশিক ব্যবস্থা চালু করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে, যা রাষ্ট্রের সামর্থ্যের বাইরে। উপরন্তু, এতে প্রশাসন হবে আরও ভারী ও ব্যয়বহুল। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীন প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ নিশ্চিত করলেই বড় সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব। অন্যদিকে, ক্যাডার ভেঙে ছোট করা বা পদোন্নতির জন্য বাধ্যতামূলক পরীক্ষা চালু করলে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ও জনসেবায় বিঘ্ন ঘটবে।
কমিশন ডিসি ও ইউএনও-র পদবিও পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। জেলা প্রশাসককে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা কমিশনার এবং ইউএনওকে উপজেলা কমিশনার করার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শুধু পদবি পরিবর্তন জনসেবা নিশ্চিত করতে পারবে না।
অন্যদিকে, কমিশনের ১৮টি প্রস্তাবকে আশু বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এর মধ্য থেকে ৮টি সহজে বাস্তবায়ন সম্ভব বলা হয়েছিল। এগুলো হলো—মহাসড়কের পেট্রল পাম্পে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটকে ডায়নামিক করা, কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা, গণশুনানি, তথ্য অধিকার আইন সংশোধন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পুনর্গঠন এবং ই-সেবা কার্যক্রম জোরদার। কিন্তু এগুলোতেও তেমন অগ্রগতি নেই।
পেট্রল পাম্পে টয়লেট বাস্তবায়নে জ্বালানি বিভাগ কিছু বৈঠক করলেও কাজ শতভাগ শেষ হয়নি। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট হালনাগাদে বাজেট জটিলতা দেখা দিয়েছে। কলেজ ও স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি গঠনে নীতিমালা পাঠানোর কাজও এগোয়নি। কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। গণশুনানি চালুর উদ্যোগও কার্যকর হয়নি। তথ্য অধিকার আইন সংশোধনে কিছু কাজ শুরু হলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে কমিশনে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। ডিজিটাল রূপান্তর ও ই-সেবা কার্যক্রমও প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
একজন সাবেক কেবিনেট সচিব জানিয়েছেন, অনেক সুপারিশই বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব নয়। এগুলো ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। অন্তর্বর্তী সরকারের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে এমন সংস্কার বাস্তবায়ন করা কঠিন। তাছাড়া সংসদ না থাকায় যেসব সুপারিশে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন, সেগুলো বাস্তবায়ন একেবারেই সম্ভব নয়।
সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী বলেছেন, সুপারিশ বাস্তবায়ন সরকারের ওপর নির্ভর করে। সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করার কথা নয়। সরকার তাদের সামর্থ্য ও সময় অনুযায়ী বাস্তবায়ন করবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবও দাবি করেছেন, বাস্তবায়ন থেমে নেই; বিভিন্ন মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে, প্রশাসন এখন নির্বাচনী প্রস্তুতিতেই ব্যস্ত। ফলে সংস্কার কমিশনের বেশিরভাগ সুপারিশ কাগজেই রয়ে গেছে।