জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রদত্ত বিভিন্ন কর ছাড়, রেয়াত ও কম হারে কর আরোপের কারণে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি ১ লাখ ৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী এই অঙ্ক দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২.৩৯ শতাংশ এবং একই সময়ে আয়কর থেকে মোট আদায়ের প্রায় ৯৯ শতাংশের সমান।
সম্প্রতি প্রকাশিত এনবিআরের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন খাতে এসব কর সুবিধা প্রদান করে থাকে। তবে এসব সুবিধাকে অনেক ক্ষেত্রে ‘রাজস্ব ব্যয়’ বা পরোক্ষ ভর্তুকি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট কর ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশই করপোরেট আয়কর খাতে দেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৭৩ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম ও সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো—এই খাতে কর ছাড়ের পরিমাণ ১২ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৭ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা এবং মূলধনী আয় (ক্যাপিটাল গেইন) খাতে ৭ হাজার ৭১ কোটি টাকার কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
তৈরি পোশাক খাতেও বড় প্রণোদনা
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে ২০২২–২৩ অর্থবছরে ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাই এ ধরনের সুবিধার মূল উদ্দেশ্য।
ব্যক্তিগত আয়কর খাতে মোট কর ব্যয় ছিল ৩৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, যা মোট কর ব্যয়ের প্রায় ৩১ শতাংশ। এর মধ্যে বেতনভিত্তিক আয়ের ওপর সর্বোচ্চ কর ছাড় দেওয়া হয়েছে—৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা।
কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতেও কর প্রণোদনা অব্যাহত রয়েছে। পোলট্রি ও মৎস্য খাতে কর ছাড়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে এসব সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে সরকার।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে প্রায় ৮১৭ কোটি টাকার কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো বাজারে তারল্য বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো।
প্রতিবেদনে কর ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও জোর দিয়ে বলা হয়েছে। অনেক কর ছাড় দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকলেও সবগুলো সমানভাবে কার্যকর নয়। তাই অপ্রয়োজনীয় ও অকার্যকর কর সুবিধা ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত—যেমন রপ্তানি বৈচিত্র্য, সবুজ অর্থনীতি, এসএমই খাত, লিঙ্গ সমতা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য—এসব ক্ষেত্রে কর সুবিধা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এনবিআর বলেছে, কর প্রণোদনার কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কর ছাড় একদিকে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়াতে সহায়তা করে, অন্যদিকে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয় কমিয়ে দেয়। তাই এ ক্ষেত্রে সুষম নীতি গ্রহণ এবং আধুনিক, কার্যকর কর ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।