ব্যাংকিং খাত সংস্কারে উদ্যোগ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো বদলের পথে সরকার

3167f31781b6d3c94e8a208f23fdcc0c-69d8b6745af39.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার লক্ষ্য করেছে যে ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি পূরণে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি জানান, সরকার ব্যাংকিং খাতে সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর—যে মান ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিদ্যমান ছিল।

তিনি আরও বলেন, দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকার ঘাটতি অর্থায়নের বিকল্প উৎস খুঁজছে। সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঋণ গ্রহণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হবে।

উন্নয়ন প্রকল্পে রাজস্ব খাত থেকে অর্থায়ন বাড়িয়ে ঋণ নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি উচ্চ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমিয়ে একটি টেকসই আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, মধ্যমেয়াদি বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিবিএফ) ও মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতি কাঠামো (এমটিএমএফ) প্রণয়নে একটি ডায়নামিক ম্যাক্রো-ফিসকাল মডেল তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর জন্য বাস্তবসম্মত প্রক্ষেপণ নির্ধারণ করা হবে এবং সে অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।

সরকারের অগ্রাধিকারমূলক লক্ষ্য

অর্থমন্ত্রী সরকারের পাঁচটি প্রধান লক্ষ্য তুলে ধরেন—

১. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে নামিয়ে আনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা।

২. রাজস্ব সংস্কার: করজাল সম্প্রসারণ, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও অটোমেশনের মাধ্যমে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং ঋণ নির্ভরতা কমানো।

৩. পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা: বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করা।

৪. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি: এসএমই খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা, সহনীয় সুদহার নিশ্চিত করা এবং উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।

৫. সামাজিক সুরক্ষা জোরদার: শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মানব উন্নয়ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকর সম্প্রসারণ।

অর্থমন্ত্রী জানান, মূলধন গঠনে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কার্যকর স্বাধীনতা দেওয়া, বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, করপোরেট বন্ড, সুকুক এবং গ্রিন বন্ড চালুর মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে বহুমাত্রিক করা হবে। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ভোগের স্বাভাবিক চক্র সচল রেখে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।

সব মিলিয়ে, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে এগোতে চায় সরকার।

 

Leave a Reply

scroll to top