সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীর ওপর নির্মিত দেশের বৃহৎ যমুনা বহুমুখী সেতুতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়েছে। প্রায় দুই দশক ধরে সেতুর ওপর থাকা রেললাইনটি এখন অপসারণ করা হচ্ছে। এর ফলে সেতুর সড়ক অংশে বাড়বে সাড়ে ৩ মিটার জায়গা, যার মাধ্যমে উভয় লেনই আরও প্রশস্ত হবে।
শুক্রবার (২৮ জুন) সকাল থেকে সেতুর পূর্ব প্রান্ত—টাঙ্গাইলের কালিহাতি অংশে—রেললাইনের স্লিপার খুলে ফেলার কাজ শুরু হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) ও যমুনা রেলসেতু প্রকল্পের পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান জানান, রেল চলাচলের জন্য যমুনা নদীর ওপর নতুন রেলসেতু চালু হওয়ায় পুরনো লাইনটির আর কোনো কার্যকারিতা নেই। ফলে এটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “গত ১৮ মার্চ নতুন যমুনা রেলসেতু উদ্বোধনের পর থেকে সেতুর ওপর রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে স্লিপার ও রেলপথ খুলে ফেলার প্রক্রিয়া চলছে, যা ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে।”
এদিকে যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবির পাভেল জানান, “রেললাইন সরিয়ে নেওয়া হলে সেতুর সড়ক অংশে আরও সাড়ে ৩ মিটার জায়গা বাড়বে। এতে সেতুর প্রতিটি লেন ১ দশমিক ৭৫ মিটার করে প্রশস্ত হবে। ফলে লেনপ্রতি প্রস্থ দাঁড়াবে ৮ মিটার। তবে এটি একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।”
উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন যমুনা সেতু উদ্বোধনের সময় সেতুর গায়ে কোনো রেললাইন ছিল না। পরে উত্তরাঞ্চলের মানুষের দাবির মুখে ২০০৩ সালে সেতুর উত্তর পাশে লোহার অ্যাঙ্গেলের মাধ্যমে রেলপথ নির্মাণ করা হয়। ২০০৪ সালের ১৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয় সেতুতে।
তবে উচ্চগতিতে ট্রেন চলাচলের কারণে ২০০৬ সালে সেতুর গায়ে ফাটল দেখা দেয়। তখন ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়। এতে একটি ট্রেনকে সেতু পার হতে সময় লাগত প্রায় ২২ মিনিট। ফলে সেতুর দুই প্রান্তে ট্রেনের দীর্ঘ জট তৈরি হতো। রেল ও সড়ক চলাচলের সমন্বয়ে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়, যা যানজট ও নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ায়।
অবশেষে, সেতুর ৫০০ মিটার উত্তরে যমুনা নদীর ওপর আলাদা রেলসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত নতুন রেলসেতুটি ২০২৪ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়, যা উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগকে করেছে আরও গতিময় ও নিরাপদ।
সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন
রেললাইন অপসারণের ফলে যমুনা সেতুর উভয় লেনে ভারী যান চলাচলের সক্ষমতা বাড়বে এবং যানজট অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলে আশা করছে সেতু কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে ঈদ ও ছুটির সময় যে বাড়তি চাপ পড়ে, তা সামলাতে এই সম্প্রসারণ কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩৫-৪০ হাজার যানবাহন চলাচল করে, যা ঈদের সময় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজারে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও এটি একটি বড় পদক্ষেপ। যেহেতু রেললাইন ও সড়ক একই অবকাঠামো ব্যবহার করত, সেখানে ছিল নানা ধরনের প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। এখন তা কেটে গেলে সেতু আরও টেকসই ও ঝুঁকিমুক্ত হবে।
যমুনা বহুমুখী সেতু দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সড়ক ও রেল যোগাযোগে একটি যুগান্তকারী সংযোগ হিসেবে কাজ করেছে। এবার এই সেতু আরও প্রশস্ত ও কার্যকর হতে চলেছে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি যোগাযোগ, অর্থনীতি ও জাতীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।