বিশ্বব্যাপী বাড়তে থাকা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির পরিকল্পনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ও বহুজাতিক করপোরেশনগুলো। সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি সামনে রেখে তারা সরবরাহ চেইন, সাইবার নিরাপত্তা এবং মানবসম্পদ কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে।
গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা পরামর্শদাতা সংস্থা সিবিলাইনস-এর প্রধান এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জাস্টিন ক্রাম্প জানান, তার ক্লায়েন্টদের মধ্যে রয়েছে বহু শীর্ষ ব্রিটিশ করপোরেশন ও মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট।
তিনি বলেন, “২০২৭ সালকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ঝুঁকির বছর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চীন-তাইওয়ান সংকট, রাশিয়ার আগ্রাসন, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং মার্কিন রাজনীতির অস্থিরতা—সব মিলিয়ে সেই বছর বিস্ফোরণ ঘটার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে।”
জানা গেছে, একই বছর ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বড় পরিসরের সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতও ২০২৭ সালকে লক্ষ্য রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বড় বড় করপোরেশনগুলো যেসব প্রস্তুতি নিচ্ছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প সরবরাহ উৎস চিহ্নিত করা, কাঁচামাল এবং যন্ত্রাংশের মজুত বৃদ্ধি এবং পণ্য উৎপাদনের বিকল্প রুট নির্ধারণ।
সাইবার নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে শঙ্কা। চীন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সাইবার হামলার আশঙ্কায় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আইটি অবকাঠামো শক্তিশালী করছে। আপডেট করা হচ্ছে পয়েন্ট অব সেলস (POS), স্টক ট্র্যাকিং সফটওয়্যার ও ক্লাউড সিস্টেমগুলো।
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও শুরু হয়েছে অগ্রিম পরিকল্পনা। যুদ্ধের সময় রিজার্ভ সেনা ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠানো হলে কর্মীসংকট দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী তালিকা বিশ্লেষণ করছে, যাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কেউ অনুপস্থিত হলে দ্রুত বিকল্প নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়।
খাদ্য সরবরাহেও আসতে পারে বিপর্যয়। কোভিড-১৯-এর সময়কার মতো পণ্যের ঘাটতি ও সীমিত বিক্রি আবার ফিরে আসতে পারে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে। তাই সরকার যেমন নাগরিকদের তিন দিনের খাবার, পানি, ব্যাটারি ও রেডিও মজুত রাখার পরামর্শ দিচ্ছে, তেমনি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও কর্মীদের জন্য ওয়ার্ক ফ্রম হোম কিট ও জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখছে।
প্রযুক্তিনির্ভরতা যুদ্ধকালীন সময়ে দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেমন সম্প্রতি একটি ঘটনায় স্পেনের সার্ভার বন্ধ থাকায় রিমোট-নিয়ন্ত্রিত ট্রাক ব্রিটেনে এসে লক খুলতে পারেনি, ফলে টমেটোভর্তি ট্রাকের মাল আনলোড করা যায়নি। এই ঘটনা দেখিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিপজ্জনক হতে পারে।
জাস্টিন ক্রাম্প বলেন, “যুদ্ধ এখন শুধু সেনাবাহিনীর বিষয় নয়—এটি খাদ্য, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরনো নিয়মে না ভেবে ‘চিন্তার বাইরে’ প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা এখন স্পষ্ট।”
বিশ্লেষকদের মতে, শান্তির দীর্ঘ সময় পেরিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় যুদ্ধের ছায়া সত্যিকার অর্থেই করপোরেট দুনিয়ায় আতঙ্ক তৈরি করেছে। তবে আশার কথা, অনেক প্রতিষ্ঠান আগেভাগেই ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতির পথে এগোচ্ছে।