ফসলহানিতে দিশেহারা কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও খাগড়াছড়িসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ফসলহানিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন লাখো কৃষক। ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়া ও জলাবদ্ধতার কারণে আধাপাকা ও পাকা ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেক কৃষকের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

হাওরজুড়ে এখন হাহাকার। চোখের সামনে তলিয়ে গেছে কৃষকদের সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল। সংসার চালানো ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। কেউ কেউ পানির মধ্যেই ধান কাটার চেষ্টা করলেও তাতে আশার আলো দেখছেন না।

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে গত তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে বন্যাসদৃশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো ধান কাটা সম্ভব হয়নি। অল্প কিছু ধান কাটতে পারলেও অধিকাংশই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এখনও পানি বাড়ছে, ফলে অবশিষ্ট ধান রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। তবে কৃষকদের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ আড়াই হাজার হেক্টরেরও বেশি। অষ্টগ্রাম হাওরের অন্তত দেড় হাজার হেক্টর জমি এখন পানির নিচে। কোমরসমান পানির কারণে ধান কাটা বন্ধ রয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ধান কাটতে না পারলে সব পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিন ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
সুনামগঞ্জে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। জেলার অন্তত ২০টি হাওরে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এতে আট-নয় লাখ কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে হাওর ও নদীর পানি সমান হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের সুযোগ নেই।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে এবার ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে, বাকি অংশের অনেকটাই এখন পানির নিচে। হারভেস্টার মেশিন থাকলেও পানির কারণে অনেক জায়গায় তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও কৃষকরা ধান কাটার চেষ্টা করছেন। তবে টানা বৃষ্টি ও ঢলে অধিকাংশ জমির ধান ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলায় অন্তত পাঁচ হাজার একর জমির ধান তলিয়ে গেছে। যারা ধান কাটতে পেরেছেন, তারাও শুকাতে না পেরে সমস্যায় পড়েছেন। অনেক কৃষকের খলায় রাখা ধানও নষ্ট হয়ে গেছে। মৌলভীবাজারে পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে প্রায় এক হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জেলার বিভিন্ন নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জুড়ী, কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলার হাওর ও নিম্নাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

নেত্রকোনায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন হাওরে অর্ধেকের বেশি ধান পানির নিচে চলে গেছে। এখনও প্রায় অর্ধেক জমির ধান কাটা বাকি রয়েছে। পানির কারণে যন্ত্র ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না, আবার শ্রমিক সংকটও রয়েছে। বজ্রপাতের ঝুঁকিও কৃষকদের জন্য বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাগড়াছড়িতে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলার প্রাথমিক হিসেবে ২২১ হেক্টর বোরো ধান, ৬৩ হেক্টর সবজি এবং ৫৪৮ হেক্টর ফলবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কৃষক তাদের একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব করা হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করে তা অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সামগ্রিকভাবে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের হাওরাঞ্চলে বড় ধরনের কৃষি বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দ্রুত পানি না নামলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরও
© All rights reserved © 2026 24ghantabangladesh
Developer Design Host BD