অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের ২০টি হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। মধ্যনগর উপজেলার কৃষক শফিক মিয়া বলেন, “ধান কাটার শ্রমিক পাচ্ছি না। পেলেও মজুরি দিতে হচ্ছে এক হাজার টাকা। এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে এক হাজার ১০০ টাকার বেশি, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০০ টাকায়। এর মধ্যে বন্যা এসে বেশিরভাগ জমির ধান ডুবিয়ে দিয়েছে।”
জেলার হাওরাঞ্চলের অন্যান্য কৃষকদের অবস্থাও একই। সরকার ধানের দাম কেজি প্রতি ৩৬ টাকা নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকরা সেই দাম পাচ্ছেন না। ভেজা ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৬০০ টাকায়, আধা শুকনো মোটা জাতের ধান ৬৫০–৭০০ টাকা এবং শুকনো চিকন ধান ৮০০–৯০০ টাকায়।
ধানের আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনও পুরোদমে ধান কেনাবেচা শুরু হয়নি। বেশিরভাগ জমির ধান কাটা বাকি। শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ মেটাতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ভেজা ধান কম দামে বিক্রি করছেন। কৃষক মানিক মিয়া বলেন, “গত বছরের তুলনায় ফলন কম। শ্রমিকের মজুরি দিতে ভেজা ধান ৬০০ টাকায় বিক্রি করছি। এর বেশি দাম পাচ্ছি না।”
আড়তদার মজিবুর রহমান জানান, “ভেজা ধান সাধারণত কেনা হয় না। তবে এবার ধান কম আসছে বাজারে। যারা আনছেন, তারা কম দামে বিক্রি করছেন।” আরেক আড়তদার মহসিন আহমেদ বলেন, “ধান উৎপাদন থেকে বাজারে আনা পর্যন্ত প্রতি মণে খরচ হচ্ছে প্রায় ১,৬০০–১,৭০০ টাকা। কিন্তু বিক্রি করে কৃষক পাচ্ছেন সর্বোচ্চ ১,৪০০ টাকা।”
কৃষকদের দাবি, সার, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অন্তত ২৫ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ছে ১,১০০ থেকে ১,৪০০ টাকা, আর মোট খরচ (কাটা, মাড়াই, পরিবহনসহ) দাঁড়াচ্ছে ১,৫০০–১,৭০০ টাকায়। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এক মণ ধান উৎপাদনে গড়ে ১,২০০ টাকা খরচ হয়, যা এ বছর বেড়ে আরও অন্তত ১০০ টাকা হয়েছে। শ্রমিকের মজুরি বেড়ে ৭০০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধান শুকানো যাচ্ছে না। টানা বৃষ্টি ও মেঘলা আকাশের কারণে অনেক কৃষক ভেজা ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। বজ্রপাতের কারণে শ্রমিক সংকটও দেখা দিয়েছে। ধর্মপাশার এক কৃষক বলেন, “প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ ১,১০০ টাকা, কাটতে লাগে ৫০০ টাকা, মাড়াই ও পরিবহনে আরও ১০০ টাকা। মোট খরচ ১,৭০০ টাকা। কিন্তু বিক্রি করছি ৬০০ টাকায়।”
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, “চোখের সামনে কৃষকের ধান তলিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই আধা ভাগিতেও শ্রমিক পাচ্ছেন না। কৃষকদের এই অসহায়ত্ব ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।” সদর উপজেলার কৃষক আতাহার আলী জানান, দুই লাখ টাকার বেশি খরচ করে ২৪ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন। বৃষ্টিতে চার বিঘা জমির ধান তলিয়ে গেছে। আশা করা ৩৫০ মণের বদলে এখন দেড়-দুইশ মণ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে খরচও উঠবে না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
কৃষকদের দাবি, দুর্যোগের সময় সরকার যদি ভেজা ধান সরাসরি কিনে মিলিংয়ের ব্যবস্থা করত, তাহলে তারা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হতেন না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪৪ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “কৃষকরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ধান কাটার চেষ্টা করছেন। তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে অনেক জমির ধান তলিয়ে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ১৫ মে’র মধ্যে ধান কাটা শেষ হতে পারে।”