আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। দেশে বিপুলসংখ্যক করদাতা ই-টিআইএন (ইলেকট্রনিক ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) গ্রহণ করলেও তাদের বড় একটি অংশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিচ্ছেন না। এতে রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, যেসব করদাতার ই-টিআইএন রয়েছে কিন্তু রিটার্ন দাখিল করেননি, তাদের শনাক্ত করে ডাটাবেজের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিশ পাঠানো হবে। প্রথমে ডিজিটাল নোটিশের মাধ্যমে সতর্ক করা হবে। এরপরও রিটার্ন জমা না দিলে কর কর্মকর্তারা সরাসরি বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।
চলতি অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন জমার সময়সীমা একাধিকবার বাড়ানোর পর গত ৩১ মার্চ শেষ হয়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ ই-টিআইএনধারী রয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৪২ লাখ করদাতা সময়মতো রিটার্ন জমা দিয়েছেন। অর্থাৎ, প্রায় ৮০ লাখের বেশি টিআইএনধারী এবারও রিটার্ন দাখিল করেননি।
রাজস্ব কর্মকর্তারা বলছেন, অনেকের করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও তারা রিটার্ন জমা দিচ্ছেন না। কেউ অজ্ঞতা বা অবহেলায় বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আয়-ব্যয়ের তথ্য গোপন করছেন—যা আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, জটিল প্রক্রিয়া এবং কর প্রদানে অনীহা—এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। তবে ডিজিটালাইজেশন ও স্বয়ংক্রিয় নজরদারি বাড়ায় এনবিআর এখন আগের চেয়ে বেশি সক্রিয়।
আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল না করলে করদাতাদের বিভিন্ন জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে। যেমন—
জরিমানা: আয়কর আইনের ২৬৬ ধারা অনুযায়ী, রিটার্ন দাখিল না করলে নিরূপিত করের ওপর ১০ শতাংশ হারে জরিমানা আরোপ করা হয় (ন্যূনতম ১,০০০ টাকা)। এছাড়া বিলম্বের জন্য প্রতিদিন ৫০ টাকা করে অতিরিক্ত জরিমানা যোগ হতে পারে।
কর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া: ১৭৪ ধারা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে বিনিয়োগজনিত কর ছাড় বা রেয়াত পাওয়া যায় না।
অতিরিক্ত করের বোঝা: বকেয়া করের ওপর প্রতি মাসে ২ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়।
রাষ্ট্রীয় সেবায় জটিলতা: বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ বিভিন্ন সেবা পেতে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
চাকরিক্ষেত্রে প্রভাব: অনেক প্রতিষ্ঠান বেতন দেওয়ার আগে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র চায়। সময়মতো তা না দিলে বেতন বিলম্ব বা আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, কর নেট সম্প্রসারণ এবং কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারা করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা ও আর্থিক ক্ষতি এড়ানো যায়। সামগ্রিকভাবে, ই-টিআইএন থাকা মানে শুধু একটি শনাক্তকরণ নম্বর পাওয়া নয়; বরং প্রতি বছর নির্ধারিত নিয়মে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা। সময়মতো রিটার্ন জমা দিয়ে করদাতারা যেমন আইনি জটিলতা এড়াতে পারেন, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারেন।