ভারতে ফেসবুক–ইউটিউবে খবর ও রাজনৈতিক পোস্টে কড়াকড়ি বাড়ানোর প্রস্তাব

india-digital-censorship-it-rules-100426-1775812624.jpg
নিজস্ব প্রতিবেদক নিউজ ডেস্ক

ভারত সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ও রাজনৈতিক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে নতুন নিয়মের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে Facebook, YouTube এবং X-এর মতো প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার, পডকাস্টার ও সাধারণ ব্যবহারকারীদেরও আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহে দেশটির ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালায় সংশোধনের প্রস্তাব প্রকাশ করে। বর্তমানে এই নীতিমালাই ডিজিটাল কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, যারা নিয়মিত খবর বা চলমান ঘটনা নিয়ে পোস্ট করেন কিন্তু নিবন্ধিত সংবাদমাধ্যম নন—তাদেরও সংবাদ সংস্থাগুলোর জন্য নির্ধারিত ‘কোড অব এথিক্স’ মেনে চলতে হবে। ফলে স্বাধীন সাংবাদিক, ইউটিউবার ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এছাড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো যদি সরকারের নির্দেশনা না মানে, তাহলে তারা ব্যবহারকারীর পোস্টের জন্য ‘সেফ হারবার’ বা আইনি দায়মুক্তি হারাতে পারে।

এই প্রস্তাব ইতোমধ্যে ডিজিটাল অধিকারকর্মী ও কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তাদের মতে, এটি কার্যত সামাজিক মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ জোরদার করতে পারে এবং ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল The Deshbhakt-এর পরিচালক আকাশ ব্যানার্জি বলেন,
“এই ধরনের নিয়ম ক্রিয়েটরদের মধ্যে ভয় তৈরি করবে, যার ফলে তারা নিজেরাই কনটেন্ট সেন্সর করতে বাধ্য হবে।”

তিনি আরও বলেন, দেশে ইতোমধ্যে অনেক আইন থাকা সত্ত্বেও ভুয়া খবর বা ঘৃণামূলক বক্তব্য কমেনি; বরং সরকারবিরোধী কনটেন্ট বেশি সরানো হচ্ছে।

সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে ভুয়া খবর, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ডিপফেক মোকাবিলা সহজ হবে। পাশাপাশি, জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব এস কৃষ্ণান বলেন,
“এখন সাধারণ মানুষও খবর প্রচার করছে, তাই সবার জন্য অভিন্ন নীতিমালা থাকা জরুরি।”

সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯-এ ধারার অধীনে সরকার কিছু এক্স অ্যাকাউন্ট ব্লক করার নির্দেশ দেয়। এসব অ্যাকাউন্টের মধ্যে অনেকগুলোতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও সরকারের সমালোচনা ছিল।

এক ব্যবহারকারী, কুমার নয়ন, জানান তার অ্যাকাউন্ট আগাম নোটিস ছাড়াই বন্ধ করা হয়েছিল। আদালতের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট ফিরে পেলেও তার কিছু পোস্ট এখনও ব্লক রয়েছে। তিনি দাবি করেন, এসব পোস্ট জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ছিল না।

এই ঘটনার ফলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।

ডিজিটাল অধিকারকর্মী নিখিল পাহওয়া মনে করেন, এই সংশোধনীগুলো “গণ-সেন্সরশিপের অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।”

২০২১ সাল থেকে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে অনলাইন কনটেন্টের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে একটি সংশোধনীতে কনটেন্ট ব্লকের নির্দেশ মানার সময়সীমা ৩৬ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে মাত্র ৩ ঘণ্টা করা হয়।

সমালোচনা ও উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও অনেক কনটেন্ট নির্মাতা পিছিয়ে যেতে রাজি নন। ব্লক হওয়া অ্যাকাউন্টধারীদের একজন সন্দীপ সিং বলেন,
“সত্যের পক্ষে কথা বলা থামানো যাবে না।”

অন্যদিকে, কুমার নয়নের মতে, আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব হলেও সবার সেই সামর্থ্য নেই। তার ভাষায়,
“গণতন্ত্রে নির্ভয়ে মত প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত—কিন্তু বাস্তবে তা কঠিন হয়ে পড়ছে।”

 

Leave a Reply

scroll to top