বিএনপির চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা বেশ জটিল। ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। এই নতুন সমস্যার পাশাপাশি তাঁর পুরোনো কিডনি, লিভার, আর্থ্রাইটিস (হাঁটু বা গাঁটের ব্যথা) এবং ডায়াবেটিসের মতো রোগগুলোও বিদ্যমান। এই বহুমুখী সমস্যার কারণে চিকিৎসকরা কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন—একটি রোগের চিকিৎসা করতে গেলেই অন্যটির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থাকে ‘অত্যন্ত সংকটময়’ বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে দেখে এসে তিনি সাংবাদিকদের কাছে এ মন্তব্য করেন।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকালে সর্বশেষ খবর অনুযায়ী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে।
এদিকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় মায়ের পাশে থাকার বিষয়ে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান। পোস্টে তিনি লিখেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ ও সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায় রয়েছেন। তাঁর রোগমুক্তির জন্য দল মত নির্বিশেষে দেশের সকল স্তরের নাগরিক আন্তরিকভাবে দোয়া অব্যাহত রেখেছেন। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা তাঁর রোগমুক্তির জন্য দোয়ার সাথে সাথে চিকিৎসার সর্বত্র সহায়তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।
দেশ বিদেশের চিকিৎসক দল বরাবরের মত তাঁদের উচ্চ মানের পেশাদারিত্ব ছাড়াও সর্বোচ্চ আন্তরিকত সেবা প্রদান অব্যাহত রেখেছেন। বন্ধু প্রতীম একাধিক রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও উন্নত চিকিৎসাসহ সম্ভাব্য সকল প্রকার সহযোগিতার আকাঙ্খা ব্যক্ত করা হয়েছে।
সর্বজন শ্রদ্ধেয়া বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সকলের আন্তরিক দোয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করায় জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে সকলের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। একই সাথে বেগম খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তির জন্য সকলের প্রতি দোয়া অব্যহত রাখার জন্য ঐকান্তিক অনুরোধ জানাচ্ছি।
তারেক রহমান বলেন, এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্খা যে কোন সন্তানের মত আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মত এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতিক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।
বিএনপির নেতারা বলছেন, গত দুই দিনে তাঁর অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। চিকিৎসকরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সম্ভব হলে দ্রুত সিঙ্গাপুরে নেয়ার বিষয়ে চিন্তা করছেন।
এদিকে খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস তিনবারের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত স্বাস্থ্যের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন এবং তাঁর সুচিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সব সহায়তা ও সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন।
বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেছেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া জাতির জন্য ভীষণ রকম অনুপ্রেরণা, তাঁর সুস্বাস্থ্য দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নেত্রীকে নিয়ে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিবৃতিতে যে সৌজন্য ও মানবিক অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে, সে জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করে গতকাল শুক্রবার সারা দেশের মসজিদে মসজিদে দোয়া ও মোনাজাত করেছে বিএনপি।
এর আগে, গত ২৩ নভেম্বর খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেদিন তাঁর অনেক শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছিল। দ্রুত তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। অবস্থার অবনতি হলে দুই দিন আগে তাঁকে হাসপাতালের কেবিন থেকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে মেডিকেল বোর্ডের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। তাঁর শারীরিক অবস্থার নেতিবাচক খবরে নেতা-কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
লন্ডনে অবস্থানরত বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান সার্বক্ষণিক খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর রাখছেন। জুবাইদা রহমান খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের একজন সদস্য। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমান শাশুড়ি খালেদা জিয়ার সঙ্গে হাসপাতালে আছেন।
খালেদা জিয়াকে দেখতে শুক্রবার বিকেলে হাসপাতালে যান মির্জা ফখরুল ইসলাম ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁরা সিসিইউর ভেতরে যাননি। বাইরে থেকে দেখে এসেছেন। পরে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের আমীর খসরু বলেন, ‘আমরা দূর থেকে দেখেছি। ইনফেকশনের ঝুঁকি আছে, তাই সিসিইউতে যাওয়া যায় না। আমরা চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি। ম্যাডামের অবস্থার উন্নতি নেই। মেডিকেল বোর্ড চেষ্টা করছে।’
খালেদা জিয়ার অবস্থার অবনতি হলে শুক্রবার রাতে সরকারের উপদেষ্টা, বিএনপি ও জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা ছুটে যান হাসপাতালে । তারা তার শারিরিক অবস্থার খোজখবর নেন। তাঁর গুরুতর অসুস্থতার খবরে দলের নেতা-কর্মীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
উৎকন্ঠিত বিএনপি বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী হাসাপাতালে আশপাশের এলাকায় সারারাত অবস্থান করেন। রাতে হাসপাতালে গিয়ে খালেদা জিয়ার খবর নেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. মঈন খানসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড প্রতিদিন বৈঠক করে চিকিৎসা দিচ্ছে।
এমএ





